বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতার প্রশ্নে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ এক ঐতিহাসিক ও আইনি সংকটের মুখোমুখি। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র (তথাকথিত শান্তি চুক্তি) ২৮ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতার যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বিশেষ করে বর্তমানে যখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন বা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে, তখন স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে বিষয়টিতে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য’ বা ন্যাশনাল কনসেনসাস তৈরি হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিতে চুক্তির সংস্কার ও পুনর্মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত করা কেবল সময়ের দাবি নয়; বরং এটি একটি অনিবার্য সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি একটি এককেন্দ্রিক প্রজাতন্ত্র। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের জন্য এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো (আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ) তৈরি করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্রের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে একই সঙ্গে দুই ধরনের আইন এবং দুই ধরনের প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’ চলতে পারে না। চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদকে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকারান্তরে ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ তৈরির একটি নীলনকশা। এর ফলে পাহাড়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর এমন এক একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতাকে প্রায় অকার্যকর করে ফেলেছে। এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থা আমাদের জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের মূলে কুঠারাঘাত করছে।
যে কোনো টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতার পূর্বশর্ত হলো সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণ। কিন্তু কথিত এই শান্তি চুক্তির সবচেয়ে বড় নৈতিক ও গণতান্ত্রিক দুর্বলতা হলো, এটি পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেনি। তৎকালীন সরকার কেবল একটি নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর (জেএসএস) প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে এই চুক্তি সম্পাদন করেছিল। ফলে পাহাড়ের প্রায় অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী অর্থাৎ ১০ লক্ষাধিক বাঙালি এবং কয়েক লক্ষ অন্যান্য প্রান্তিক নৃ-গোষ্ঠীর মতামত ও অধিকার এই চুক্তিতে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে গেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো এলাকার অর্ধেকের বেশি মানুষকে অন্ধকারে রেখে এবং তাদের মতামত উপেক্ষা করে করা কোনো চুক্তি কি নৈতিকভাবে বৈধ হতে পারে? সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমান অধিকার পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু এই চুক্তির ফলে পাহাড়ের বাঙালিরা নিজ দেশে আজ ‘তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এ পরিণত হয়েছে। সেখানে তাদের পরিচয়ই প্রশ্নের মুখে। জাতি-উপজাতির পর পাহাড়ের বাঙালিদের পরিচয় দাঁড়িয়েছে ‘অউপজাতি’ হিসেবে যেন এটি আরেকটি নতুন জাতি! তাদের রাজনৈতিক অধিকার, ভোটাধিকার ও ভূমির অধিকার এমনভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, যা সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যদি এই চুক্তি সকল জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সম্পাদিত হতো, তবে আজ পাহাড়ে সকল নাগরিকের সুষম উন্নয়ন ও প্রকৃত রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারত।
এই চুক্তির অসাংবিধানিক চরিত্র কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি উচ্চ আদালত কর্তৃক স্বীকৃত এক বাস্তবতা। মহামান্য হাইকোর্ট ইতোমধ্যে এই চুক্তির অনেকগুলো ধারাকে সংবিধানবিরোধী ও রাষ্ট্রীয় সংহতিবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। আমিও আমার গবেষণায় দেখিয়েছি যে, চুক্তির ১১ নম্বর ধারা এবং ভূমি সংক্রান্ত বিধিবিধানগুলো সংবিধানের ৭(২) ও ২৬(২) নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সংবিধান যেখানে সর্বোচ্চ আইন, সেখানে সংবিধানকে পদদলিত করে এমন চুক্তির দাবি তোলা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমানে এ-সংক্রান্ত মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চেম্বার আদালতের ‘স্টে অর্ডার’-এর মাধ্যমে হাইকোর্টের সেই ঐতিহাসিক রায়ের কার্যক্রম বছরের পর বছর স্থগিত রয়েছে এবং মামলাটি রহস্যজনক কারণে বারবার কার্যতালিকায় উঠেও পিছিয়ে যাচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যখন আইনি মারপ্যাঁচে আটকে থাকে, তখন তা গোটা জাতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ন্যায়বিচার ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে সরকার এখন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বা অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে চুক্তির অসাংবিধানিক ধারাগুলো সংস্কার করা আজ আইনি বাধ্যবাধকতা।
সরকার যখন নতুন উদ্যোগে ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি বা ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ করেছে, সেখানে পাহাড়ের এই অমীমাংসিত সংকটটি শীর্ষ অগ্রাধিকারে থাকা বাঞ্ছনীয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যারা পাহাড়ের বর্তমান প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করবে। ১৮০ দিনের মধ্যে অন্তত একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব, যা চুক্তির আমূল সংস্কারের পথ প্রশস্ত করবে।
চুক্তির প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল শান্তি ও উন্নয়ন। কিন্তু ২৮ বছর ধরে অগণতান্ত্রিক ও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা পাহাড়ের ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে আছেন। চুক্তির শর্তে সৃষ্ট আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। অথচ এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেখানে কোনো নির্বাচন হয়নি। এই জগদ্দল পাথর সরাতে হলে অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই।
প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের মধ্য দিয়ে সরকার যে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে, তাকে তাত্ত্বিক ও আইনি ভিত্তি দিতে হলে চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন তথা সংস্কারও অপরিহার্য।
চুক্তির কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই। অথচ একটি গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক মহলের ইন্ধনে এই শব্দটির মাধ্যমে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ দাবি করছে। এর মাধ্যমে তারা পাহাড়কে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আইনি পটভূমি তৈরি করছে।
গত ৩ মার্চ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করাকে কেন্দ্র করে আমার ওপর যে ‘মব’ আক্রমণের চেষ্টা হয়েছিল, তা ছিল এই সংস্কারের দাবিকে স্তব্ধ করার এক পরিকল্পিত অপচেষ্টা। তারা জানে, যদি চুক্তির সংস্কার হয় এবং সংবিধানের পূর্ণ শাসন পাহাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তাদের একচ্ছত্র জমিদারি ও চাঁদাবাজির রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। তথাকথিত সুশীলদের একটি অংশ যে দেশভাগের চিত্রনাট্য লিখছে, তা রুখে দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো চুক্তির সংস্কার এবং পাহাড়কে মূল সংবিধানের অধীনে পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ে আসা।
পাহাড়ের শান্তি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া বা তাদের অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখার নাম নয়। শান্তি মানে হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালি নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার। বর্তমান চুক্তির ফলে পাহাড়ে যে তথাকথিত উন্নয়ন হচ্ছে, তার সুফল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ভোগ করছে। সাধারণ উপজাতীয়রাও আজ এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজি ও জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চায়।
যদি সকল জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তবেই কেবল পাহাড়ে সুষম উন্নয়ন সম্ভব। বর্তমান চুক্তির দ্বৈত ও বৈষম্যমূলক কাঠামো এই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আমাদের এমন একটি সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি বাংলাদেশের সাধারণ আইন ও সংবিধানের অধীনে পরিচালিত হবে।
ইতিহাসে এমন সুযোগ বারবার আসে না। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল উভয়ই যখন চুক্তির সংস্কার ও পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তখন রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বিশাল শক্তি ও রাজনৈতিক পুঁজি। এই জাতীয় ঐকমত্য বা ন্যাশনাল কনসেনসাসকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এমন একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করতে হবে, যা গত ২৮ বছর ধরে পবিত্র সংবিধান এবং জাতিকে ক্ষতবিক্ষত করছে।
১৮ কোটি মানুষের এই দেশে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অসাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা দিয়ে বাকি নাগরিকদের অধিকার হরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা এবং চব্বিশের বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের চেতনার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক।
পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন জনপদ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ কোনো অলঙ্ঘনীয় দলিল বা আসমানী কিতাব নয় যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে একে পরিবর্তন বা সংশোধন করা যাবে না। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে যেকোনো চুক্তি বা আইন সংস্কার করার পূর্ণ ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রয়েছে। বর্তমান সময়ে যদি রাষ্ট্র এই ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিশেষ করে বর্তমানে যখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন বা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে, তখন এটি স্পষ্ট যে বিষয়টিতে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য’ বা ন্যাশনাল কনসেনসাস তৈরি হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিতে চুক্তির সংস্কার ও পুনর্মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত করা কেবল সময়ের দাবি নয়; বরং এটি একটি অনিবার্য সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।
সরকারের কাছে বিনীত আহ্বান অবিলম্বে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে এই বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করুন। উচ্চ আদালতের সহায়তায় ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করুন। সেই কমিশনে পাহাড়ে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হারে যোগ্য প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করে চুক্তির অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক ধারাগুলো আমূল সংস্কার করুন। পাহাড়ের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অখণ্ডতা রক্ষার এই লড়াইয়ে দেশের সকল দেশপ্রেমিক নাগরিককেই আজ সজাগ ও আন্তরিক হতে হবে। সত্যের পথে আমাদের এই অবিচল যাত্রায় সংবিধানের বিজয় অনিবার্য।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ইমেইল: [email protected]

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন