× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ০২:১০ এএম

নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদ যাত্রা নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৬, ০২:১০ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল ফিতর মানেই শেকড়ের টানে এক বিশাল জনস্রোত। যান্ত্রিক নগরীর কর্মব্যস্ততা ফেলে প্রতিটি মানুষ তখন চায় মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন আর শৈশবের স্মৃতিঘেরা আঙিনায় ফিরে যেতে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ‘ঘরে ফেরা’ কেবল একটি যাত্রা নয়, বরং এটি এক পাক্ষিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে গত কয়েক দশকের ট্র্যাজেডি হলো—এই উৎসবের আনন্দযাত্রাই অনেকের জন্য পরিণত হয় জীবনের শেষ যাত্রায়। সংবাদপত্রের পাতায় ঈদ যাত্রার বর্ণনায় ‘ভোগান্তি’ আর ‘দুর্ঘটনা’ শব্দ দুটি যেন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-এর এই পরিবর্তিত ও সংস্কারমুখী বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—জনগণের এই আবেগঘন যাত্রাকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও মর্যাদাপূর্ণ করা।

বিগত আওয়ামী শাসনামলে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে দুর্নীতির পাহাড় গড়ে উঠেছিল। বড় বড় মেগা প্রজেক্টের গল্প শোনানো হলেও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের নিরাপত্তা ছিল চরমভাবে উপেক্ষিত। গণমাধ্যমের গত ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন হাজারো মানুষ। এই মৃত্যুর মিছিলের প্রধান কারণ ছিল পরিবহন সেক্টরে ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট সিন্ডিকেট। 

তৎকালীন সময়ে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িকে মহাসড়কে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতো। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে চালকদের লাইসেন্স ও দক্ষতার তোয়াক্কা করা হতো না। ফলে ঈদ যাত্রা মানেই ছিল এক অনিশ্চিত গন্তব্য। ট্রেনের টিকিটের কালোবাজারি থেকে শুরু করে বাসের টিকিটে কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়া আদায়—সবই চলত প্রশাসনের নাকের ডগায়। বিগত বছরের সম্পাদকীয়গুলোতে উঠে এসেছিল কীভাবে সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা—পরিবহন মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্নীতির কারণে সড়কগুলো এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল।

বর্তমান সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন, তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ট্রাফিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেভাবে ভিভিআইপি কালচার পরিহার করে সাধারণ ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এর আগে আমরা দেখেছি, একজন ভিভিআইপি-র চলাচলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে হাজার হাজার মানুষকে জ্যামে আটকে রাখা হতো।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ‘রাজকীয়’ প্রথা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি লালবাতি জ্বালিয়ে বা রাস্তা ব্লক করে চলাচলের ঘোর বিরোধী। তিনি নিজে সড়ক আইন মেনে চলছেন, যা পুরো পুলিশ বাহিনী এবং প্রশাসনের জন্য এক নীরব অথচ শক্তিশালী বার্তা। তাঁর এই সময়ানুবর্তিতা এবং ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়’—এই নীতি যদি এবারের ঈদ যাত্রায় প্রতিটি মহাসড়কে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে সড়ক শৃঙ্খলা রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বারবার নির্দেশনা দিচ্ছেন যে, রাস্তার শৃঙ্খলা কেবল চালকদের ওপর নির্ভর করে না, বরং প্রশাসনের কঠোর তদারকি এবং আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। তাঁর এই সদিচ্ছাই এবারের ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করার প্রধান চালিকাশক্তি।

এবারের ঈদ যাত্রা নিরাপদ ও আনন্দময় করতে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। আমার মতে, নিচের পয়েন্টগুলো এখন সময়ের দাবি। 

১. ফিটনেসবিহীন যান ও নছিমন-করিমন নিয়ন্ত্রণ: অতীতে দেখা গেছে, যাত্রীচাপ সামলাতে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান বা অকেজো লোকাল বাস মহাসড়কে নামানো হতো। হাইওয়ে পুলিশকে এখন থেকেই কঠোর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী, মহাসড়কে কোনো প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে তিন চাকার ছোট যানগুলো যেন বড় রাস্তার বিশৃঙ্খলা না ঘটায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

২. ভাড়া নৈরাজ্য ও টিকিট সিন্ডিকেট দমন: প্রতি বছরই বাসের ভাড়া নিয়ে এক ধরনের তুঘলকি কায়দা চলে। বিআরটিএ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে টার্মিনালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বুথ বসিয়ে তদারকি করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশে অনলাইনে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে যেন কোনো তৃতীয় পক্ষ বা ‘বট’ ব্যবহার করে কালোবাজারি করতে না পারে, সেজন্য সাইবার সিকিউরিটি জোরদার করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী যে স্বচ্ছতার কথা বলছেন, তার প্রথম প্রমাণ হতে হবে স্বচ্ছ টিকিট ব্যবস্থাপনা।

৩. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন: ঈদ যাত্রায় যানজটের একটি বড় কারণ হলো যত্রতত্র যাত্রী নামানো এবং অবৈধ পার্কিং। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অস্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে হবে। যেখানেই বাধা সৃষ্টি হবে, সেখানেই রেকার বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভিভিআইপি প্রোটোকল বন্ধ হওয়ায় ট্রাফিক পুলিশের বিশাল একটি অংশ এখন সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে, যা জ্যাম কমাতে সহায়ক হবে।

৪. পর্যায়ক্রমে ছুটি ও শিল্পাঞ্চলের চাপ ব্যবস্থাপনা: সারা দেশের শিল্পাঞ্চলের লাখ লাখ শ্রমিক যখন একসাথে পথে নামে, তখন ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ২০-২৩ রমজানের মধ্যে দিয়ে পর্যায়ক্রমে ছুটি দিলে মহাসড়কের ওপর এককালীন চাপ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। এটি সফল করতে হলে শ্রম মন্ত্রণালয় এবং পরিবহন মালিকদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় থাকতে হবে।

৫. মহাসড়কের অবকাঠামো ও হাট-বাজার উচ্ছেদ: অনেক সময় দেখা যায় মহাসড়কের ওপরই পশুর হাট বসে। এবারের ঈদে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বার্তা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাস্তার ওপর জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা যাবে না। হাট বা অস্থায়ী বাজারগুলো মহাসড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে হবে।

৬. রেল ও নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধি: কেবল সড়কের ওপর চাপ না দিয়ে রেলওয়ের স্পেশাল সার্ভিস সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রতিটি বগিতে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি বাড়ানো দরকার। নৌপথে লঞ্চের ছাদে যাত্রী বহন করা এবং অদক্ষ চালক দিয়ে লঞ্চ চালানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। কোস্ট গার্ড এবং নৌ-পুলিশকে বিশেষ করে মেঘনা ও পদ্মা অববাহিকায় সতর্ক থাকতে হবে।

একটি দেশের বিমানবন্দর এবং মহাসড়ক হলো সেই দেশের সামগ্রিক শৃঙ্খলার আয়না। আন্তর্জাতিক ক্রেতা এবং পর্যটকরা যখন দেখেন বাংলাদেশের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে বা ট্রাকের ওপরে চড়ে বাড়ি ফিরছে, তখন আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খল বাংলাদেশের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তার সফল প্রয়োগ আমরা এই ঈদ যাত্রায় দেখতে চাই। যদি এবারের যাত্রা নিরাপদ হয়, তবে এটি প্রমাণিত হবে যে নতুন সরকার কেবল প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং জনগণের জীবন রক্ষায়ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিরাপদ ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ যেন দীর্ঘায়িত বা রক্তে রঞ্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময়ানুবর্তিতা এবং ভিভিআইপি প্রোটোকল ত্যাগের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কর্মী সৎ ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, তবে ইনশাআল্লাহ এবারের ঈদ যাত্রা হবে স্মরণকালের সবচেয়ে নির্বিঘ্ন যাত্রা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected] 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!