× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আব্দুল্লাহ আল মামুন 

প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

খাল খনন: গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির নীরব বিপ্লব

আব্দুল্লাহ আল মামুন 

প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ বাংলাদেশে উন্নয়নের যে ধারা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেকাংশে উপেক্ষিত উপাদান হলো খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম। নদীমাতৃক এই দেশে খাল, বিল ও জলপথ শুধু পরিবহন বা পানির উৎস নয়—এগুলো কৃষি, মৎস্য, জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দখল, ভরাট ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে অসংখ্য খাল তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা, কৃষি উৎপাদনে স্থবিরতা এবং জীবিকায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে খাল খনন কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।

প্রথমত, খাল খনন সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি, আর কৃষির জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির কারণে ফসল নষ্ট হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। খালগুলো পুনঃখনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেই খালগুলো থেকেই সেচের জন্য পানি ব্যবহার করা যাবে। এতে ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত, খাল খনন মৎস্য খাতকে নতুন করে প্রাণবন্ত করতে পারে। গ্রামীণ এলাকার বহু মানুষ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মৎস্য উৎপাদনে। খাল পুনরুদ্ধার হলে মাছের প্রজনন ও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে। এর ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়বে, যা একদিকে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করবে।

তৃতীয়ত, খাল খনন কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। খাল খননের কাজ নিজেই শ্রমনির্ভর হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া খাল পুনরুদ্ধারের ফলে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়ে ওঠে।

চতুর্থত, খাল খনন পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলাবদ্ধতা কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—এসব ক্ষেত্রে খালের ভূমিকা অপরিসীম। খালগুলো সচল থাকলে বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে, ফলে বন্যার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমে। একই সঙ্গে খালের আশপাশে গড়ে ওঠা সবুজ পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।

পঞ্চমত, খাল খনন স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও সহায়ক। একসময় গ্রামীণ অঞ্চলে নৌপথ ছিল প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। খালগুলো পুনরুদ্ধার হলে আবারও ছোট নৌযান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা পণ্য পরিবহনকে সহজ ও কম খরচের করে তুলবে। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।

তবে এই সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খাল দখল হয়ে গেছে বা অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যা খাল পুনঃখননের পথে বড় বাধা। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনা, টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শুধুমাত্র খাল খনন করলেই হবে না; বরং খালকে জীবিত রাখতে নিয়মিত তদারকি ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাল সংরক্ষণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দখলমুক্ত করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে খাল ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা যেতে পারে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, খাল খনন শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্য খাতের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন—সবকিছুই সম্ভব। ফলে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।

যদি পরিকল্পিতভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খাল খনন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়, তবে গ্রামীণ বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। আর সেই উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের কাছে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক  

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!