বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষের আন্তর্জাতিক চলাচল শুধু ভ্রমণের বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, চিকিৎসা, গবেষণা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে ভিসার জন্য আবেদন করেন। বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার নাগরিক যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত এবং অন্যান্য দেশে বৈধভাবে ভিসার আবেদন করেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মধ্যে একটি গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক আবেদনকারী মনে করেন, প্রকৃত ও যোগ্য আবেদনকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা ভিসা প্রত্যাখ্যানের শিকার হচ্ছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বহু ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের কারণ সংক্ষিপ্ত, সাধারণ বা অস্পষ্ট থাকে এবং অনেক ভিসা শ্রেণিতে স্বাধীন আপিলের সুযোগও সীমিত।
এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
প্রথমেই একটি মৌলিক নীতি পরিষ্কার করা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা পাওয়া একটি স্বয়ংক্রিয় বা মৌলিক মানবাধিকার নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কোন বিদেশি নাগরিককে প্রবেশের অনুমতি দেবে তা নিজস্ব আইনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে। এই নীতি জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক রীতিগত আইনেও সুপ্রতিষ্ঠিত।
তবে রাষ্ট্রের এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। আধুনিক প্রশাসনিক আইন, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো প্রত্যাশা করে যে সরকারি সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন, যুক্তিসঙ্গত এবং ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গৃহীত।
সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)-এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতি স্বীকার করে। ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ কার্যকর প্রতিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে, যখন কোনো স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘিত হয়। ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ দেশের অভ্যন্তরে চলাচল এবং নিজ দেশ ত্যাগ ও ফিরে আসার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও এই ঘোষণা অন্য কোনো রাষ্ট্রে প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করে না, তবুও এটি ন্যায্য প্রশাসনিক আচরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একইভাবে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ICCPR) আইনের শাসন, বৈষম্যহীনতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার নীতিকে গুরুত্ব দেয়। ভিসা সিদ্ধান্তে এই নীতিগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, বিশেষত যখন সিদ্ধান্তটি পারিবারিক জীবন বা অন্য কোনো সুরক্ষিত অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও দেখা যায় যে, সাধারণভাবে বিদেশি নাগরিকের কোনো নির্দিষ্ট দেশে প্রবেশের অধিকার নেই। তবে যদি কোনো ভিসা সিদ্ধান্ত পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন বা বৈষম্যের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
যুক্তরাজ্যে অতীতে অধিকাংশ ভিজিট ভিসার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ আপিলের সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই অধিকার সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা, বিচারিক পর্যালোচনা বা মানবাধিকারভিত্তিক আপিলের সুযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশেও শেঙ্গেন ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা বিচারিক পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা আছে, যদিও দেশভেদে প্রক্রিয়া ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ব্যবস্থাও এক নয়। কিছু ভিসা শ্রেণিতে পুনর্বিবেচনা বা ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, আবার অনেক ক্ষেত্রে নতুন আবেদনই বাস্তবসম্মত পথ। তাই “কোনো দেশেই আপিলের সুযোগ নেই” বা “সব দেশেই আপিলের সুযোগ আছে” এই দুই ধরনের সাধারণীকরণ সঠিক নয়। প্রতিটি দেশের আইন এবং ভিসার ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা ভিন্ন।
আমার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন সময় এসেছে একটি ন্যূনতম প্রশাসনিক ন্যায্যতার মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করার।
প্রথমত, প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব স্পষ্ট, নির্দিষ্ট এবং তথ্যভিত্তিক কারণ উল্লেখ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তাজনিত ব্যতিক্রম ছাড়া সীমিত স্বাধীন পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ছোটখাটো নথিগত ঘাটতি থাকলে আবেদনকারীকে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
চতুর্থত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে দূতাবাস ও কনস্যুলার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং মাননিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, আবেদন ফি, প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রত্যাখ্যান নীতিতে আরও স্বচ্ছতা আনা উচিত।
বাংলাদেশ সরকারেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। উন্নত নথি যাচাই ব্যবস্থা, আবেদনকারীদের প্রশিক্ষণ, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে অনেক সমস্যা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রকৃত আবেদনকারীদের আইনি সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইনবিদ, নীতিনির্ধারক এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদেরও এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরু করা উচিত। বৈধ ভ্রমণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বিশ্ব অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য ভিসা ব্যবস্থা কেবল আবেদনকারীদের স্বার্থই রক্ষা করে না, বরং গন্তব্য রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদাও বৃদ্ধি করে।
আমরা কোনো রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সার্বভৌম অধিকারের বিরোধিতা করছি না। আমরা আহ্বান জানাচ্ছি একটি আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত প্রশাসনিক ব্যবস্থার, যেখানে প্রতিটি আবেদনকারী অন্তত জানবেন কেন তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং যেখানে উপযুক্ত, সেখানে একটি কার্যকর পুনর্বিবেচনার সুযোগ পাবেন।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে একটি সত্যিকার মানবিক ও আধুনিক আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থার ভিত্তি।
লেখক: আন্তর্জাতিক অভিবাসন আইন বিশ্লেষক

