পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার পর অনেক মুমিনের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন উঁকি দেয় যে, তারাবির নামাজ না পড়লে দিনের বেলার রোজা কবুল হবে কি না। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, রোজা ও তারাবির নামাজ দুটি পৃথক ইবাদত। রোজা রাখা ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি এবং এটি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ।অন্যদিকে, তারাবির নামাজ হলো সুন্নতে মুয়াক্কাদা বা রাসুল (সা.)-এর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালনকৃত একটি সুন্নত। অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো কারণে তারাবির নামাজ আদায় করতে না পারেন, তবুও তার রোজা নষ্ট হবে না এবং রোজাটি নিয়মানুযায়ী সম্পন্ন হবে।
তবে রোজা ও তারাবির মধ্যে গভীর একটি যোগসূত্র রয়েছে। তারাবি শব্দের অর্থ বিশ্রাম বা প্রশান্তি, যা রোজাদারকে সারাদিনের সিয়াম সাধনার পর এক বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দান করে।
১. সূচনালগ্ন ও প্রেক্ষাপট
‘তারাবি’ শব্দটি আরবি 'তারবিহাতুন' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া। দীর্ঘ এই নামাজে প্রতি চার রাকাত অন্তর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া হয় বলে একে তারাবির নামাজ বলা হয়। এটি রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত, যা এশার নামাজের পর এবং বিতরের আগে আদায় করতে হয়।
২. তারাবির নামাজের বিধান
তারাবির নামাজ নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নতে মুয়াক্কাদা। অনেকে এটিকে নফল মনে করে অবহেলা করেন, যা ঠিক নয়। মহানবী (সা.) নিজে এটি আদায় করেছেন এবং সাহাবিগণকেও উৎসাহিত করেছেন। রাকাত সংখ্যা নিয়ে (৮ বা ২০ রাকাত) মতভেদ থাকলেও মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ কিরাআতে নামাজ আদায় করা।
৩. তারাবির ফজিলত : হাদিসের আলোকে
তারাবির নামাজের বিশেষ সওয়াব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়ামু রমজান (তারাবি) আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এই একটি হাদিসই তারাবির গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট। এটি কেবল শারীরিক কসরত নয়, বরং মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ।
৪. তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও উপকারিতা
তারাবির নামাজ কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ:
কোরআন শ্রবণ : তারাবির মাধ্যমে পুরো পবিত্র কোরআন খতম করা বা অন্তত বড় একটি অংশ শোনার সুযোগ হয়।
তাকওয়া অর্জন : দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার মাধ্যমে ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।
শারীরিক সুস্থতা : ইফতারের পর ভারী খাবারের ফলে শরীরে যে আলস্য আসে, দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায়ের ফলে সেই ক্যালরি খরচ হয় এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।
সামাজিক বন্ধন : জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের ফলে পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হয় এবং সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।
৫. প্রচলিত বিভ্রান্তি ও সমাধান
অনেকেই মনে করেন, তারাবি না পড়লে রোজা হবে না, এটি একটি ভুল ধারণা। রোজা ও তারাবি দুটি ভিন্ন ইবাদত। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারাবি ছেড়ে দেওয়া বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার শামিল। রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে নিজের সাধ্যমতো ও খুশু-খুযুর (বিনয়) সাথে নামাজ আদায় করাই শ্রেয়।
রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতের এই বিশেষ নামাজ মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি আনে। তাই বিভ্রান্তি এড়িয়ে সহিহ নিয়তে তারাবি আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য।


