পবিত্র শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক মহিমান্বিত ও স্মরণীয় রাত। এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রসুল হজরত মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বিশেষ সম্মান দান করেন এবং ইসরা ও মেরাজের মাধ্যমে তাঁকে অসংখ্য নিদর্শন দেখান। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই রাতের শিক্ষা, তাৎপর্য ও ফজিলত অত্যন্ত গভীর।
ইসরা ও মেরাজ: অলৌকিক সফরের ঘটনা
এক রাতে আল্লাহর কুদরতে রসুলুল্লাহ (স.)-কে মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়, যা ইসরা নামে পরিচিত। এরপর মসজিদুল আকসা থেকে তিনি ঊর্ধ্বজগতে ভ্রমণ করেন, যা মেরাজ নামে পরিচিত। এই সফরের মাধ্যমে নবিজি (স.) আসমানের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ করেন। এই ঘটনাকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, যা এর সত্যতা ও মর্যাদা প্রমাণ করে।
শবে মেরাজের রাতের বিশেষ ফজিলত
শবে মেরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা রসুলুল্লাহ (স.)-কে উম্মতের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও অতুলনীয় নেয়ামত দান করেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, এই রাতে নবিজি (স.)-কে তিনটি বড় উপহার দেওয়া হয়:
- পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ—যা মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
- সুরা বাকারার শেষ কয়েকটি আয়াত, যা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়।
- যেসব ব্যক্তি শিরক থেকে মুক্ত থাকবে, তাদের জন্য ক্ষমার প্রতিশ্রুতি।
এই উপহারগুলো প্রমাণ করে যে শবে মেরাজ উম্মতের জন্য রহমত ও কল্যাণের বার্তা বহন করে।
সিদরাতুল মুনতাহা ও ঊর্ধ্বজগতের নিদর্শন
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (র.) বর্ণনা করেন, মেরাজের রাতে রসুলুল্লাহ (স.)-কে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে ফেরেশতাদের যাতায়াতের সীমা শেষ হয়। কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
- ‘যখন সিদরাহ গাছটি আচ্ছাদিত হওয়ার ছিল, তা দ্বারা আচ্ছাদিত হলো।’ (সুরা নাজম: ১৬)
- এই রাতেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসুলকে মহান নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করেন।
শবে মেরাজ পালন বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
শবে মেরাজ নিঃসন্দেহে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাত। তবে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, রসুলুল্লাহ (স.) এই রাতকে বিশেষভাবে পালন করেছেন বা উম্মতকে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত করতে বলেছেন।
মেরাজের ঘটনা ঘটেছিল হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে, মক্কা জীবনে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নবিজি (স.) ও সাহাবি (র.)-গণ এই রাতকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ ইবাদতের প্রচলন করেননি।
২৭ রজব ও শবে মেরাজের প্রচলিত ধারণা
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ২৬ রজব দিবাগত রাত বা ২৭ রজবকে শবে মেরাজ হিসেবে পালন করা হয়। তবে মেরাজ ঠিক এই তারিখে সংঘটিত হয়েছিল—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। এই তারিখটি দুর্বল সনদের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত হয়েছে।
বিশুদ্ধ সূত্রে শুধু এটুকু জানা যায়, মেরাজ হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল; নির্দিষ্ট দিন ও তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
শবে মেরাজের রাতে নামাজ ও রোজা
অনেকে শবে মেরাজের রাতে বিশেষ নামাজ আদায় করেন এবং পরদিন রোজা রাখেন। কিন্তু এসব আমলের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। এ সংক্রান্ত যেসব হাদিস প্রচলিত আছে, সেগুলোর অধিকাংশই দুর্বল বা জাল।
তাই বিশেষ ফজিলতের বিশ্বাসে এই রাতে আলাদা করে নামাজ বা রোজা পালন করলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে।
বিদআত থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ব
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও রসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নত। এ দুটির বাইরে কোনো আমলকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন মনে করে চালু করা দীনের মধ্যে নতুন সংযোজন বা বিদআত।
রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সব নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। কেননা প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ)
শবে মেরাজ থেকে আমাদের করণীয়:
শবে মেরাজের মূল শিক্ষা হলো—
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যত্নবান হওয়া
- শিরক থেকে বেঁচে থাকা
- আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ইমান রাখা
- কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা
বিশেষ কোনো রাতকে কেন্দ্র করে নতুন আমল উদ্ভাবনের চেয়ে শবে মেরাজের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে সারা জীবন তা বাস্তবায়ন করাই একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম আমল।





