ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রমজানে তারাবির নামাজ; নিয়ম, নিয়ত ও ফজিলত

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৯:৪৪ এএম
তারাবির নামাজ। ছবি : সংগৃহীত

পবিত্র মাহে রমজানের অন্যতম বিশেষ ইবাদত তারাবির নামাজ। তারাবি শব্দটি আরবি রাহাতুন থেকে এসেছে, যার অর্থ আরাম বা বিশ্রাম। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার পর প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়ার কারণে একে তারাবির নামাজ বলা হয়। এটি মূলত সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।

তারাবির নামাজের নিয়ম
১. সময়: এশার নামাজের ফরজ ও সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে তারাবির নামাজ পড়তে হয়।

২. রাকাত সংখ্যা: বিশ্বজুড়ে ওলামায়ে কেরামদের ঐকমত্য অনুযায়ী তারাবির নামাজ ২০ রাকাত। এটি দুই রাকাত করে মোট ১০ সালামে পড়তে হয়।

৩. পদ্ধতি: প্রতি দুই রাকাত পরপর সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়। এরপর চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া এবং তাসবিহ পাঠ করা সুন্নত।

তারাবির নামাজের নিয়ত
নিয়ত মনে মনে করাই যথেষ্ট। তবুও মুখে উচ্চারণ করে বলতে চাইলে এই নিয়তটি করতে হবে।

আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহে তায়ালা রাকাআতাই সালাতিত তারাবিহে সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তায়ালা। অর্থ: আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তারাবির দুই রাকাত সুন্নাত নামাজ পড়ার নিয়ত করছি।

তারাবির নামাজের মোনাজাতের দোয়া
তারাবির নামাজের বিরতি বা শেষে এই দোয়াটি পড়তে হয়:

আরবি উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা জান্নাতা, ওয়া নাউযুবিকা মিনান নার। ইয়া খালিকাল জান্নাতা ওয়ান নার, বিরাহমতিকা ইয়া আযিযুল গাফফার। ইয়া কারিম, ইয়া রাহামার রাহিমিন।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আপনার আশ্রয় চাই। হে জান্নাত ও জাহান্নামের স্রষ্টা! আপনার দয়া ও করুণার মাধ্যমে আমাদের ক্ষমা করুন। হে দয়াময়, হে পরম করুণাময়।

তারাবির নামাজের ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সাথে ও সওয়াব পাওয়ার আশায় রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল (তারাবির নামাজ) পড়ে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)।

তারাবির নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই আমাদের সকলের উচিত পবিত্র রমজানে গুরুত্বের সঙ্গে এই নামাজ আদায় করা।

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তারাবির নামাজ ২০ রাকাত না ৮ রাকাত, এ নিয়ে মতবিরোধ মূলত ফিকহ শাস্ত্রের ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়েছে।

১. ২০ রাকাত মতবাদ (হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি ও অধিকাংশ ফকিহ)
দলিল: সাহাবায়ে কেরামদের আমল। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সাহাবিগণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০ রাকাত তারাবি পড়তেন। পরবর্তী খলিফাদের সময়েও এই আমল অব্যাহত ছিল।

হাদিস: হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) রমজানে ২০ রাকাত নামাজ এবং বিতর পড়তেন। (বায়হাকি, কিতাবুল মারেফা)। তবে এই হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে ভিন্ন মত আছে।

২. ৮ রাকাত মতবাদ (মালেকি মাজহাবের কিছু অংশ ও আহলে হাদিস বা সালাফি মতাদর্শ)
দলিল: হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রমজানে নবীজি (সা.)-এর নামাজ কেমন ছিল? তিনি বলেছিলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ও রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

ব্যাখ্যা: এই মতের অনুসারীরা মনে করেন, ১১ রাকাত (৮ রাকাত তারাবি + ৩ রাকাত বিতর) হলো নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ এবং এটিই সবচেয়ে শুদ্ধ।

অধিকাংশ আলেম মনে করেন, এটি এমন কোনো বিতর্ক নয়, যা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে। ২০ রাকাতের পক্ষে সাহাবিদের ঐকমত্য রয়েছে। ৮ রাকাতের পক্ষে সরাসরি নবীজির (সা.) হাদিস রয়েছে। তাই যে যে মতের অনুসরণ করেন, তাদের প্রত্যেক আমলই গ্রহণযোগ্য।