ইসলাম ইবাদত-বন্দেগিসহ সব বিধানেই অত্যন্ত সাদাসিধা ও সহজ নীতি রেখেছে। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের সময়, কিবলা নির্ণয়, চাঁদ দেখা ইত্যাদির বিধান মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ দর্শনের ওপরই নির্ভরশীল রেখেছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহর বা দূরপল্লী অথবা দ্বীপ বা পাহাড়ের অধিবাসী কিংবা সমুদ্র বা বনাঞ্চলের অভিযাত্রী সবার জন্য হিসাবযন্ত্র ছাড়াই সর্বদা সহজে বিধান পালনের সুযোগ হয়। এই সহজবোধ্য ও শাশ্বত নীতির আলোকেই সেহরি ও ইফতারের সময় ব্যবস্থাপনায় নিচের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
১. সেহরির সময় ও সতর্কতা
সেহরি খাওয়া সুন্নাহ এবং এটি রোজা রাখার শক্তি জোগায়।
শেষ সময়ে সেহরি করা : সেহরির সময়ের একদম শেষ দিকে খাওয়া সুন্নাহ। তবে সতর্কতামূলকভাবে সুবহে সাদিকের ৫-১০ মিনিট আগেই খাওয়া শেষ করা উত্তম।
খাবারের নির্বাচন : দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয় বলে সেহরিতে জটিল শর্করা (যেমন : লাল চালের ভাত, ওটস) এবং প্রচুর পানি পান করা উচিত।
অতিরিক্ত মসলা বর্জন : অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার সেহরিতে এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এটি সারাদিন তৃষ্ণা এবং বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।
২. ইফতারের সময় ও সতর্কতা
সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দেরি না করে ইফতার করা মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল।
দ্রুত ইফতার করা : সূর্য ডোবার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই ইফতার করে নেওয়া উচিত। বিনা কারণে দেরি করা অনুচিত।
খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু : রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করতেন। এটি তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে গ্লুকোজের জোগান দেয়।
ভাজাপোড়া নিয়ন্ত্রণ : ইফতারে বেগুনি, পেঁয়াজু বা তৈলাক্ত খাবার আমাদের দেশে জনপ্রিয় হলেও এগুলো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ায়। এর বদলে ফল এবং ঘরে তৈরি শরবত বেশি কার্যকর।
রোজার পবিত্রতা রক্ষা এবং সঠিক সময়ে ইবাদত সম্পন্ন করার জন্য সময়ের নির্ভুলতা বজায় রাখা একান্ত জরুরি।
১. নির্ভরযোগ্য ক্যালেন্ডার যাচাই
সেহরি ও ইফতারের সঠিক সময়ের জন্য সর্বদা স্থানীয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা সরকার অনুমোদিত নির্ভরযোগ্য ক্যালেন্ডার অনুসরণ করুন। বাজারে প্রচলিত অনেক ক্যালেন্ডারে সময়ের কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। তাই সর্বশেষ হালনাগাদ করা সময়সূচি দেখে নেওয়া নিরাপদ।
২. শুধু আজানের ওপর নির্ভর না করা
ইফতার বা সেহরির ক্ষেত্রে শুধু মসজিদের আজানের অপেক্ষায় বসে থাকা সব সময় নিরাপদ নয়। অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটি বা অনিচ্ছাকৃত কারণে আজান দিতে কয়েক মিনিট দেরি হতে পারে। তাই নিজের কাছে একটি নির্ভুল ঘড়ি রাখা এবং ক্যালেন্ডারের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সেহরি শেষ করা ও ইফতার শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ।
৩. ভ্রমণকালীনের সমন্বয়
আপনি যদি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভ্রমণ করেন, তবে অবশ্যই সেই স্থানের ইফতার ও সেহরির সময় জেনে নেবেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জেলাভেদে সময়ের কয়েক মিনিটের ব্যবধান হয়ে থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘ পথ ভ্রমণের সময় আপনার বর্তমান অবস্থানের সঠিক সময়সূচিটি সঙ্গে রাখুন অথবা নির্ভরযোগ্য মোবাইল অ্যাপের সাহায্য নিন।
৪. শেষ সময়ের সতর্কতা
সেহরির শেষ সময়ের অন্তত ৫ মিনিট আগে খাবার ও পানীয় গ্রহণ বন্ধ করা একটি উত্তম অভ্যাস। এতে করে সময়ের হেরফের হওয়ার কারণে রোজা নষ্ট হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। একইভাবে সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে ইফতার করা সুন্নাহ।
স্বাস্থ্যগত সতর্কতা
একসাথে বেশি না খাওয়া : ইফতারের সময় খুব দ্রুত এবং প্রচুর পরিমাণে খেয়ে ফেলা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে হজমে সমস্যা এবং ক্লান্তি আসতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি : ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করুন, যাতে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি না হয়।
সেহরির সময় শেষ হওয়ার পর মুখে খাবার থাকা অবস্থায় গিলে ফেললে রোজা হবে না। তাই ক্যালেন্ডারের নির্ধারিত সময়ের অন্তত দু-তিন মিনিট আগে খাবার ও পানীয় গ্রহণ বন্ধ করা নিরাপদ।


