ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হজের মাহাত্ম্য আধ্যাত্মিক শান্তি ও বিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০৯:০২ এএম
হজবিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলা। ছবি : সংগৃহীত

ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে হজ অন্যতম, যা কেবল একটি শারীরিক ইবাদত নয়, বরং এটি ত্যাগ, ধৈর্য এবং পরম স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক অনন্য মহড়া। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলিম মক্কার পবিত্র ভূমিতে সমবেত হন। বর্ণ, ভাষা এবং ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে সাদা দুই টুকরো ইহরামে তারা একাকার হয়ে যান এক অভিন্ন পরিচয়ে।

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ ও হজের গুরুত্ব
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার ওপর অবশ্য কর্তব্য” (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)। হজ একজন মুমিনকে তার পাপ ধুয়ে মুছে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়। এটি মূলত আল্লাহর মেহমান হওয়ার এক মহিমান্বিত সফর।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কোরবানি ও শয়তানকে পাথর মারা
হজের প্রতিটি পরত জড়িয়ে আছে ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে, বিশেষ করে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতির সঙ্গে।

কোরবানি: হজের সময় যে কোরবানি দেওয়া হয়, তা মূলত হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করার সেই চরম পরীক্ষার স্মৃতি। এটি শিখিয়ে দেয় যে, স্রষ্টার আদেশের সামনে মানুষের নিজের আবেগ ও মায়া তুচ্ছ।

শয়তানকে পাথর মারা (রমি): মিনায় শয়তানকে পাথর মারার বিষয়টিও ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যখন তিনি আল্লাহর আদেশে পুত্রকে কোরবানি দিতে যাচ্ছিলেন, তখন শয়তান তাকে তিনবার প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিল। তিনি পাথর ছুড়ে শয়তানকে বিতাড়িত করেন। বর্তমান হাজীরাও সেই প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানি শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করার শপথ নেন।

বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক
বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্বে হজের সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। হজ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম বার্ষিক সম্মেলন।
১. সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: রাজা হোক বা প্রজা, হজের ময়দানে সবাই একই পোশাকে একই কাতারে দাঁড়ান। এটি ইসলামের সাম্যবাদী আদর্শের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

২. বিশ্ব ঐক্য: বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমরা যখন একসাথে 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনি তোলেন, তখন তা মুসলিম উম্মাহর সংহতিকে ফুটিয়ে তোলে।

৩. আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি: আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান রোকন। হাজারো মানুষের কান্নাকাটি ও ক্ষমা প্রার্থনার দৃশ্য এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে, যা মানুষের মন থেকে অহংকার দূর করে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

হজ কেবল একটি সফর নয়, এটি আত্মিক পুনর্জাগরণের পথ। এই সফরের মাধ্যমে একজন মানুষ যেমন স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করে, তেমনি বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও শক্তির পরিচয় পায়। হজের এই শিক্ষা যদি ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিফলন ঘটে, তবেই পৃথিবীর বুকে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।