হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহাররমের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত। আগামীকাল শুক্রবার (২৬ জুন) পবিত্র আশুরার পালল করা হবে মুসলিম জাহানে। এই দিনটির উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্র ও রাষ্ট্রপতি বানী দিয়েছেন।
এই প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা বিষয়ে...
ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের প্রথম মাস ‘মহাররম’। মহাররম আরবি শব্দ, যার অর্থ সম্মানিত। এর অর্থ নিষিদ্ধও বোঝায়। মহাররম মাস ছাড়া ইসলামে রজব, জিলহজ ও জিলকদ—এই তিনটি মাসও সম্মানিত। কোরআনে বর্ণিত আছে, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২, তার মধ্যে ৪টি মাস (মহাররম, রজব, জিলহজ ও জিলকদ) বিশেষভাবে সম্মানিত।’ (সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)
পবিত্র এই মাসগুলোতে ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ। এসব নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড থেকে মাসটি পবিত্র ও মুক্ত বলে একে সম্মানিত মাস বলা হয়।
মহাররম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। এই বিশেষ দিনটিতে এমন অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। পৃথিবী সৃষ্টির আবহমানকাল থেকে আশুরার দিনটি বিশেষ ঘটনা প্রবাহের ধারক। দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত, যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।
১০ মহাররম বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদত দিবস হওয়ার সুবাদে বর্তমান সময়ে আশুরার গুরুত্ব আরও গভীরভাবে অনুভূত হলেও ইসলামের ইতিহাসে এই দিনের অসংখ্য তাৎপর্যময় ঘটনা রয়েছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে মহাররম মাসের ১০ তারিখে বরকতময় এমন কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যা অনেকের অজানা। এসব স্মৃতির সম্মানার্থেও মহাররম মাসকে সম্মানিত মাস বলা হয়ে থাকে।
আশুরার দিনে মানবজাতির ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি হয় এবং এই দিনেই পৃথিবী ধ্বংস হবে। এই দিনে আল্লাহতায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে ক্ষমা করেছিলেন। হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পায়। নবী ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এই দিনে বহু নবী-রাসুল জন্মগ্রহণ করেন। এই দিনেই হযরত মুসা (আ.) ফেরাউনের নির্মম অত্যাচার থেকে মুক্তি পান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পান। হযরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ রোগভোগের পর আল্লাহর কৃপায় আরোগ্য লাভ করেন।
সর্বোপরি, এই দিনে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ইসলামের শাশ্বত আদর্শ সমুন্নত রাখতে কারবালার প্রান্তরে শহীদ হন। এই মর্মান্তিক ঘটনা মুসলিম মানসে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। অতীতে অনেক ঘটনা সংঘটিত হলেও হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার কারণে সর্বাধিক আবেদনময়, বেদনাবহ ও তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে আছে।
বাতিলের বিরুদ্ধে হকের প্রতিষ্ঠায় সেদিনের সেই লড়াই ত্যাগের মহিমায় আজও জাতির জীবনে অম্লান হয়ে আছে।
কারবালা প্রান্তরে অসম যুদ্ধে হযরত হোসেন (রা.)-এর শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই ও আত্মবলিদানের অদম্য স্পৃহা আজও মুসলিমদের মন ও মননে প্রেরণা জোগায়।
কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইয়াজিদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, ঘৃণা এবং অন্যায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদতের মাধ্যমে জাতির জন্য শিক্ষণীয় বার্তা। তাই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—‘ইসলাম জিন্দা হতে হ্যায়, হর কারবালা কে বাদ।’
ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদত বরণ ছিল কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার মূল শিক্ষা। নবী (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত সত্য, ধর্ম ও ন্যায়ের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তিনি জীবন উৎসর্গ করেন।
ইচ্ছা করলেই হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ইয়াজিদের আনুগত্য মেনে নিয়ে পার্থিব সুখে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। নানাজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শে গড়ে ওঠা ইমাম হোসেন (রা.) আল্লাহর মনোনীত ধর্মের মর্যাদা রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
তার শাহাদত গোটা মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছে—সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্যায়, জুলুম ও অবিচার দূর করতে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও পিছপা হওয়া যাবে না। হকের সঙ্গে বাতিলের আপস নয়; বরং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত কল্যাণ ও শান্তি।
বর্তমানে আশুরাকে সামনে রেখে কিছু মুসলিম আবেগের আতিশয্যে এমন কিছু কর্মকাণ্ড করে থাকেন, যা ইসলামের মূল শিক্ষা ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামের মৌলিক দর্শন হলো—ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি।
সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং অধিকার রক্ষা করা—এটাই ইসলামের জীবনাদর্শ। এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যই হযরত ইমাম হোসেন (রা.) মহাররম মাসের আশুরার দিনে শাহাদত বরণ করেন।
ইমাম হোসেন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হয়ে বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁর আত্মত্যাগ মানুষ যুগ যুগ ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
আশুরার রোজা
আশুরার দিনের বিভিন্ন ঘটনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম আমল হলো রোজা পালন করা। পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণও (আ.) আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর আশুরার রোজা ফরজ ছিল।
হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আশা করি, আল্লাহ এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দেবেন।’ (মুসলিম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরা ও রমজানের রোজার প্রতি যেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতেন, অন্য কোনো রোজার ব্যাপারে সেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতেন না। (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ এবং এর সঙ্গে আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা রাখ।’ (মুসনাদে আহমদ)
সুতরাং মহাররমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা মুস্তাহাব।
হাদিসের বর্ণনা এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলে আশুরা উপলক্ষে রোজা পালনের আমলের কথাই পাওয়া যায়। অথচ এ পবিত্র দিনকে ঘিরে আমাদের সমাজে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড দেখা যায়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের পবিত্র আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন