× UCB Sticker Card
সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাহীনুর ইসলাম শানু

প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

পায়রা বন্দরে ক্রেন ক্রয়ে জালিয়াতি

শাহীনুর ইসলাম শানু

প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

পায়রা বন্দর। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

পায়রা বন্দর। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প ‘পায়রা বন্দর’ এখন দুর্নীতির কালো মেঘে আচ্ছন্ন। পটুয়াখালীর এই বন্দরে মালামাল ওঠানামার জন্য প্রায় ৪২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মোবাইল হারবার ক্রেন (এমএইচসি) ক্রয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি হয়েছে।

দরপত্রের কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতাহীন একটি চীনা কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই ক্রেন ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। টেন্ডারের শর্তাবলিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, অংশগ্রহণকারী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মোবাইল হারবার ক্রেন (এমএইচসি) তৈরিতে ন্যূনতম ১০ বছরের প্রমাণিত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া, গত ১০ ক্যালেন্ডার বছরে নির্দিষ্ট বা তার বেশি ক্ষমতার অন্তত ১০টি ইউনিট এমএইচসি বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করার রেকর্ড থাকতে হবে। অভিজ্ঞতার সপক্ষে ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের সন্তোষজনক সনদ এবং সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিস্তারিত যোগাযোগ নম্বরসহ (ফ্যাক্স ও ইমেইল) পারফরম্যান্স রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।

তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত চীনা কোম্পানি ‘এক্সসিএমজি’র (XCMG) ওয়েবসাইটে তাদের এমন কোনো উৎপাদন সক্ষমতা বা বিশ্বজুড়ে ক্রেন সরবরাহের রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই কোম্পানিকে নির্বাচনের পেছনে পায়রা বন্দরের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে খোদ বন্দর কর্তৃপক্ষের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এক্সসিএমজি কোম্পানির বন্দর সরঞ্জাম পরিচালনায় পর্যাপ্ত আঞ্চলিক বা ব্যাবহারিক অভিজ্ঞতা নেই। ফলে ভবিষ্যতে এই ক্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দরপত্রের শর্তের সঙ্গে জমা দেওয়া নথিপত্র পুনর্মূল্যায়ন (Re-evaluation) করা হলে এই জালিয়াতির সত্যতা মিলবে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

টেন্ডার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই মোবাইল হারবার ক্রেনটি উৎপাদন করবে চীনের জিয়াংসু প্রদেশের জুজৌ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ‘এক্সসিএমজি কনস্ট্রাকশন মেশিনারি কোম্পানি লিমিটেড’। প্রস্তাবিত মডেলটি হলো ‘XMHC 3840’। দরপত্র অনুযায়ী, ক্রেন সরবরাহের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ‘এক্সসিএমজি-এইচপি’ (XCMG-HP) জয়েন্ট ভেঞ্চার।

আর্থিক হিসাবে দেখা যায়, ক্রেনটির বিদেশি মূল্য ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ৬২২ মার্কিন ডলার। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) যার পরিমাণ প্রায় ৪১ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮৪ টাকা। এর সঙ্গে স্থানীয় অন্যান্য খরচ হিসাবে ২০ লাখ টাকা যুক্ত হয়ে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪২ কোটি ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮৪ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৪২ কোটি টাকার এই ক্রেন যদি অকেজো বা নিম্নমানের প্রমাণিত হয়, তবে বন্দরের অপারেশনে স্থবিরতা নেমে আসবে।

এমএইচসি উৎপাদনে বিশ্বের সেরা কোম্পানিগুলো হলো- ইতালির গটওয়ার্ল্ড, জার্মানির লিবহার এবং চীনের জেনমা। অখ্যাত কোম্পানিকে সুযোগ দিতে পৃথিবীর বিখ্যাত কোম্পানিগুলোকে দরপত্রে আহ্বান জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অতিরিক্ত ১৫৮ কোটি টাকার গোপন চুক্তি

এমএইচসি ক্রেন ক্রয়ের অনিয়মের মধ্যেই অন্য একটি সূত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ‘এইচপি-এনজে’ জয়েন্ট ভেঞ্চারের সঙ্গে আরও দুটি শিপ-টু-শোর বা কোয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেন সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই ক্রেন দুটি উৎপাদন করবে চীনের ‘নানজিং পোর্ট-মেশিনারি অ্যান্ড হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানি লিমিটেড’।

ক্রয়সংক্রান্ত নথি বলছে, প্রতিটি এসটিএস ক্রেনের দাম ধরা হয়েছে ৬০ লাখ ৬৩ হাজার ৫৭২ মার্কিন ডলার। দুটি ক্রেনের মোট দাম ১ কোটি ২১ লাখ ২৭ হাজার ১৪৪ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। স্থানীয় খরচসহ এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৮ কোটি ২ লাখ ১১ হাজার ৫৬৮ টাকা। এমএইচসি ক্রেনের মতো এই ক্রেন ক্রয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

দায় এড়ানোর সংস্কৃতি ও নিরুদ্দেশ কর্তৃপক্ষ

এই বিশাল অঙ্কের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে ‘রূপালী বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। হারবার ও মেরিন সদস্য কমোডর মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি এই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত নই, তাই কিছু বলতে পারব না।’ অন্যদিকে সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, পিডি ছাড়া এ বিষয়ে অন্য কারো কথা বলা সমীচীন নয়।

তবে মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিনের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবালকেও ফোনে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পায়রা বন্দরের মতো একটি ক্রমবর্ধমান বন্দরে সরঞ্জামের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই না করে অখ্যাত কোম্পানি থেকে যন্ত্রপাতি কিনলে সেটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা ও খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বন্দরটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিচালনাগত সংকটে পড়বে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, যদি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার প্রমাণ না থাকে, তবে অবিলম্বে এই কার্যাদেশ বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও জেঁকে বসবে।
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!