রাতের ঢাকা বর্তমান অনেকটা অনিরাপদ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন ঢাকায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা যাত্রী ও রাতের কর্মজীবী মানুষ! এ সমস্ত শ্রেণীর মানুষের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা ঢিলা ঢালা রয়েছে। তাছাড়া পুলিশের টহল অনেকটা দায়সারা বলে অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (১৮ মে) রাত দশটা থেকে মঙ্গলবার ভোর রাত পর্যন্ত ঢাকাই চলাচলরত একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
মহাখালী বাস টার্মিনালে কথা হয় জামালপুর থেকে আশা দম্পতি সাদ্দাম ও নিলা হোসেনের সঙ্গে। তারা অভিযোগ করে জানান, আগে ঢাকার রাস্তায় পুলিশের যে টহল ছিল অনেকটা সেই টহল এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ঢিলা ঢালা ভাবে দেখা গেছে। এই দাম্পত্যের অভিযোগ, মাছ টার্মিনালের নেমে তাদের চোখে তেমন পুলিশের নিরাপত্তার বিষয়টি চোখে পড়িনি যার কারণে রাত তিনটার পর বাস থেকে নেমে তারা টার্মিনাল কাউন্টারে অবস্থান করছেন।
একইভাবে কথা হয় হানিফ পরিবহনের যাত্রী স্বপন ও সাথী কুন্ডুর সঙ্গে। তারা গভীর রাত দুইটার পর খলি বাস কাউন্টারে নেমেছেন কিন্তু থাকার কারণে তাদের ঢাকায় বসবাসরত স্থান যাত্রাবাড়ীতে যেতে সাহস পায়নি। যদিও এসব বিষয়ে সাথী কুন্ডু জানান, বেশ কিছু আগে সাধারণ মানুষ পুলিশকে ভয় পেত, বর্তমান সময়ে কেউ কাউকে ভয় পায় না এবং বিপদে পড়লে কেউ পাশে এসে দাঁড়াতে চাই না। যার কারণে পরিবারের সন্তান নিয়ে গভীর রাত হলেও টার্মিনাল ও তার আশেপাশে অবস্থান করতে বাধ্য হই। অর্থাৎ রাস্তায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকলেও জুলাই পরবর্তী সময়ে আমাদের মনের ভিতরে ভয় ও আতঙ্ক রয়েছে যার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা অবস্থান করছি।
শুধু সাদ্দাম ও নীলা এবং স্বপন সাথী দাম্পত্য নয় এমন অসংখ্য মানুষ রাত দিন প্রতিদিন ঢাকায় প্রবেশ করেন এবং তারা ঢাকার বসবাস স্থান অর্থাৎ গন্তব্যে যেতে বিড়ম্বনায় পড়েন। যদিও জুলাই বিপ্লবের পর সারাদেশে কিছু চিহ্ন ঘটনা ঘটে এবং পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হন কিন্তু দীর্ঘ দেড় বছর পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের গঠনের পর অনেকটা আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকার ঘোষণা দেন বিএনপি সরকার।
যদিও অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি তোমার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু চুরি ছিনতাই ডাকাতি কিশোর গ্যাং এর উৎপাত ও খুনের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পিছনের রহস্য বের করতে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের বিশেষ ইউনিট মাঠে কাজ করছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সর্বোচ্চ জানা গেছে।
শীর্ষ সন্ত্রাস ও চিহ্নিত অপরাধীরা নজরদারিতে-
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক সূত্র মতে, গত তিন মাসে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় ৩ শতাধিক অপরাধের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে খুন, ধর্ষণ, চুরি ডাকাতি ও কিশোর গ্যাং এর উৎপাতসহ বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে থাকতে নির্দেশনার পাশাপাশি অপরাধীদের ধরতে সারাদেশের মাঠে নামে প্রশাসন। সরকার অপরাধীদের ধরতে ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসন কাজ করে পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শীর্ষ সন্ত্রাস ও চিহ্নিত অপরাধীদের নজরদারিতে রাখা হয়।
সারাদেশে একটি অসাধু রাজনৈতিক চক্র দেশে অস্থিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে, সতর্ক সরকার সর্বোচ্চ নির্দেশনা প্রতিরোধ!
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের এক যুগ্ম সচিব জানান, সারাদেশে একটি অসাধু রাজনৈতিক চক্র দেশে অস্থিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে। এসব বিষয়ে সতর্ক সরকার সর্বোচ্চ নির্দেশ প্রতিরোধের! পাশাপাশি ঈদ ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পুলিশসহ সমগ্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কেউ যাতে হয়রানি শিকার না হয় এসব বিষয়ে মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নির্দেশনা রয়েছে।
শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও জনগণের মালের নিরাপত্তা বজায় রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক ও কঠোর-
এদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বজায় রাখা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক অনুষ্ঠানে সরকার প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন একটি সুদক্ষ আধুনিক মানবিক পুলিশ বাহিনী ছাড়া জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। এই কঠিন কাজটি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শুরু করেছে। আর পুলিশের কাজ দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই অন্ধকারের সময় পেরিয়ে এখন সময় এসেছে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার। আমি মনে করি, জনগণের বিশ্বাস অর্জন এবং সেই বিশ্বাস বজায় রাখাই পুলিশের সামনে বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ।
পুলিশের কাজ দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হোক আস্থা এবং নির্ভরতার। যেকোনো বিপদে-আপদে জনগণ যেন, থানা পুলিশকে তাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল মনে করতে পারে, আপনাদের কাছে আমার এতটুকুই চাওয়া।
পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা বলে থাকি, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি মালিক হয় তাহলে এই মালিক যখন বিপদে পড়ে থানায় যায়, সেখানে তারা আপনাদের আচরণে যেন কিছুটা হলেও, রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্বের অংশ বলে আমি মনে করি। আপনাদের মনে রাখা দরকার, আইনি সহায়তা পেতে সাধারণ মানুষ প্রথমেই থানায় আসে। পুলিশের সহায়তা চান।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ প্রশাসন কোনো দলের নয়, বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসন পরিচালিত হবে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা অবশ্যই আপনাদের দায়িত্ব। আমরা থানাগুলোর পরিবেশ এমনভাবে করতে চাই, যা আইজি সাহেব ওনার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, যেন একজন মানুষ কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি থানায় গিয়ে নির্ভয়ে তার অভিযোগ জানাতে পারেন এবং একসাথে প্রতিকারও পেতে পারেন।
বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্লোবাল ভিলেজের এই বিশ্ব ব্যবস্থা একদিকে মানুষের মনোজগতে যেমন পরিবর্তন এনেছে অপরদিকে পাল্টেছে অপরাধের ধরণ। সুতরাং বাংলাদেশ পুলিশকে একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন, আধুনিক, দক্ষ ও যুগোপযোগী বাহিনীতে রূপান্তর করতে অপরাধ বিশ্লেষণ সক্ষমতা জোরদার, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, সরকার দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে চায়। গুম অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা প্রতিটি পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এসব বিষয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে সাধারণ মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যে কোনো বিশৃঙ্খলা রোধে এবং জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে এমনটা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও অবৈধ জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চলমান। পাশাপাশি ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তার পরিকল্পনা আছে। আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত, পশুর হাটের নিরাপত্তা এবং চাঁদাবাজি রোধে বিশেষ ব্যবস্থা ও মনিটরিং সেল চালু রয়েছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে যা যা করণীয় সরকার সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই ক্ষেত্রে অপরাধী যেকোনো দলের হোক না কেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন