ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে একসময় প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে নিজের ফুটবল বুট, জার্সি ও ট্রেনিং সরঞ্জাম পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। সেই গিলই এখন বিশ্বমঞ্চে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স প্যারাগুয়েকে তুলে দিয়েছে শেষ ষোলোয়। আর এই রাতটিই তাকে বানিয়ে দিয়েছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত নামদের একজন। তার স্বীকৃতিস্বরূপ মিলেছে ম্যাচসেরার পুরস্কারও।
জার্মানি ও প্যারাগুয়ের ম্যাচটি নির্ধারিত সময় এবং অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১-১ গোলে শেষ হয়। ৪২তম মিনিটে হুলিও এনসিসোর গোলে এগিয়ে যায় প্যারাগুয়ে। তবে ৫৪তম মিনিটে কাই হাভার্টজ সমতা ফেরান জার্মানির হয়ে। এরপর আর কোনো দলই গোল করতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে প্যারাগুয়ে ৪-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। আর এই টাইব্রেকারেই নায়ক হয়ে উঠেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল।
পুরো ম্যাচজুড়েই জার্মানির আক্রমণ সামলাতে হয়েছে গিলকে। জার্মান আক্রমণের সামনে অদম্য প্রাচীর হয়ে গিল একের পর এক শট রুখে প্যারাগুয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। অতিরিক্ত সময়েও তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।
টাইব্রেকারে জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তার ঠাণ্ডা মাথার পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়ের জয় নিশ্চিত করে।
তবে মাঠের ভেতরের নায়কের গল্পের চেয়েও কঠিন ছিল তার মাঠের বাইরের জীবন। সন্তানের জন্মের সময় জটিল চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে একসময় নিঃস্ব হয়ে পড়েন গিল। বাধ্য হয়ে তিনি নিজের ফুটবল বুট, ট্রেনিং কিট এবং অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি পর্যন্ত বিক্রি করেন।
সেই ত্যাগই তাকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। জীবনের সেই সংগ্রামই যেন তার প্রতিটি সেভে ফিরে এসেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
২৬ বছরের গিল ফুটবলে বিশেষ পরিচিত নাম ছিলেন না। বর্তমানে আর্জেন্টিনার ক্লাব সান লরেঞ্জো দে আলমাগ্রোর হয়ে খেলছেন ২৬ বছর বয়সী গিল। চলতি মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ২২টি ম্যাচ খেলেছেন।
আর্জেন্টিনার ক্লাবে খেলার আগে প্যারাগুয়ের একটি ক্লাবেই খেলতেন গিল। ২০২০ সাল থেকে সেখানে খেলার পর ২০২৩ সালে তাকে লোনে নেয় আর্জেন্টিনার ক্লাব। তার পর থেকে সেখানেই খেলছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সান লরেঞ্জোর হয়ে অভিষেকের পর দুই বছরে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেন। এরই মধ্যে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ছিল। কিন্তু স্ত্রী মেলিসা অ্যাভালোসের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে ৩০ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ৭ ডিসেম্বর তার প্রসব বেদনা শুরু হয়।
তবে, গুরুতর জটিলতার কারণে একদিন পার হলেও সন্তানের জন্ম হয়নি। ফলে পরবর্তীতে স্ত্রী মেলিসার জরুরি অস্ত্রোপচার এবং সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অরল্যান্ডোর স্ত্রী মেলিসা ইনস্টাগ্রাম পোস্টে কিছু ছবি যুক্ত করে বলেন, ‘আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের স্মৃতি। তখন আমাদের ছেলে লাউতির জন্ম হয়েছিল, আর আমাদের কাছে কিছুই ছিল না। সেই সময় অরল্যান্ডো যে ক্লাবে খেলত, সেখানকার নিজের জিনিসপত্র একে একে বিক্রি করে সন্তানের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ চালিয়েছিল।’
তিনি আরও লেখেন, ‘সে সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিল। অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের জার্সিটাও বিক্রি করে দিয়েছিল—যেটা স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়ারও সুযোগ হয়নি। নিজের পোশাক, বুট—আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিল।’
জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল তার দশম ম্যাচ। এই স্বল্প অভিজ্ঞতার মধ্যেই তিনি বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজের জাত চেনালেন। ঠাণ্ডা মাথার এই গোলরক্ষক বিশ্বকাপে জার্মানিকে বিদায়ের দরজা দেখিয়েছেন। তবে তার আগে জীবনযুদ্ধও অতিক্রম করতে হয়েছে তাকে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন