মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সরগরম এবারের ফিফা বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্ট জুড়ে রেফারিং, শাস্তি প্রত্যাহার, ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার, ড্র প্রক্রিয়া এবং আয়োজকদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক বিশ্বকাপ ঘিরে আলোচিত কয়েকটি বিতর্ক ও অভিযোগ বিশ্লেষণ করেছে। তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোর বিষয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং কিছু অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলেও ফিফা এ বিষয়ে কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেনি।
একইভাবে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকের দাবি, বিশ্বকাপে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
টুর্নামেন্ট চলাকালে ফিফার ঘোষিত নতুন ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের অভিযোগ, ফিফা কাউন্সিলের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়াই এই পুরস্কার চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথম এই সম্মাননা দেওয়াও বিতর্কের জন্ম দেয়।
বিশ্বকাপের নতুন ড্র বিন্যাস নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ দলগুলোকে ফাইনালের আগে মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত রাখতে বিশেষ সিডিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যাতে বড় ম্যাচগুলো শেষ পর্যন্ত ধরে রেখে বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
এবারের বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক চালুর সিদ্ধান্তও আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের দাবি, খেলোয়াড়দের বিশ্রামের পাশাপাশি এটি সম্প্রচারকারীদের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও ফিফা জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষাই ছিল এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
ইংল্যান্ড ও নরওয়ের কোয়ার্টার ফাইনালেও বিতর্ক দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে, স্কাইক্যামের তারে বলের দিক পরিবর্তন হওয়ার পর ইংল্যান্ড গোলের সুযোগ পায়। তবে ম্যাচ কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে এমন অভিযোগ নাকচ করেন।
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ৩-৩ ড্র ম্যাচ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শেষ মুহূর্তে দুই দলের খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে আসা দেখে অনেকেই ম্যাচটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে সংশ্লিষ্ট কোচরা পাতানো ম্যাচের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। আলজেরিয়া, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ভিএআর, রেফারিং এবং শাস্তি প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও কোচদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। তবে ফিফার রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ম্যাচ কর্মকর্তাদের সততার প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরের মতো এবারও নানা বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর অনেকগুলোরই এখনো সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ফিফা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের সিদ্ধান্তকে নিয়মসম্মত বলে দাবি করেছে।

