জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিশ্ব সংস্থাটির নেতৃত্বে কে আসছেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এখনো কোনো একক ‘স্পষ্ট ফেভারিট’ নেই, তবে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিশ্লেষকদের মতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)-এর প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইতোমধ্যে উন্মুক্ত সংলাপ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের রুদ্ধদ্বার ভোটের মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচনের চূড়ান্ত বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হবে। এবারের দৌড়ে রয়েছেন ছয়জন অভিজ্ঞ কূটনীতিক, যাদের মধ্যে চারজনই নারী। ফলে জাতিসংঘের ৮১ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নারী মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।
আলোচনার শীর্ষে যারা
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে আলোচিত নাম আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) বর্তমান মহাপরিচালক হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধ, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তার অভিজ্ঞতা বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এখনো তিনি একচ্ছত্র সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইউএনসিটিএডি প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছেন।
এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন চিলির সাবেক দুইবারের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট। প্রতিরোধমূলক কূটনীতি ও মানবাধিকার ইস্যুতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত করছে কূটনৈতিক মহল।
আফ্রিকা থেকে একমাত্র প্রার্থী সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল। আফ্রিকান ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে তার বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় রয়েছেন ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা এবং গায়ানার জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রড্রিগেজ-বার্কেট।
নেপথ্যের 'ভেটো' রাজনীতি
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিয়োগ দিলেও বাস্তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটির আপত্তি বা কার্যত ভেটো কোনো প্রার্থীর সম্ভাবনাকে শেষ করে দিতে পারে।
প্রথাগত আঞ্চলিক আবর্তন নীতি অনুযায়ী এবার ল্যাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকা অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সে কারণেই এবারের প্রার্থীদের তালিকায় এই দুই অঞ্চলের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এমন একজন মহাসচিবকে বেছে নিতে চাইবে পরাশক্তিগুলো, যিনি তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হবেন।
আগামী ৩০ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম রুদ্ধদ্বার ভোটের পরই পরিষ্কার হতে শুরু করবে—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদটির দৌড়ে কার অবস্থান কতটা শক্ত এবং শেষ পর্যন্ত কার মাথায় উঠতে পারে জাতিসংঘের মহাসচিবের মুকুট।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন