ইয়েমেন, সুদান ও লেবানন ইস্যুতে সৌদি আরবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে চরম উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক ‘মেগা’ প্রতিরক্ষা ও পরমাণু চুক্তি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
সোমবার (২০ জানুয়ারি) দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এদিন আমিরাতের আমির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মাত্র তিন ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত দিল্লি সফরে এই মেগা চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হয়।
চুক্তির আওতায় দুই দেশ প্রথমবারের মতো বড় আকারের পারমাণবিক চুল্লি এবং স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR) তৈরির বিষয়ে একমত হয়েছে। মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং একটি সুপারকম্পিউটিং ক্লাস্টার তৈরির বিষয়েও বড় ধরনের সমঝোতা হয়েছে।
এছাড়া, পরবর্তী ১০ বছরের জন্য ভারতের এইচপিসিএল-কে এলএনজি সরবরাহে ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লিতে স্বাক্ষরিত এই স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স পার্টনারশিপ এবং সিভিল নিউক্লিয়ার এনার্জি চুক্তি বিশ্ব রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেন, সুদান ও লেবানন ইস্যুতে রিয়াদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের প্রেক্ষাপটে আমিরাতের এই পদক্ষেপ মূলত একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক বলয় তৈরির ইঙ্গিত।
ভারতের সঙ্গে আমিরাতের এই পরমাণু ও প্রতিরক্ষা চুক্তির পেছনে ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
সৌদি-আমিরাত প্রকাশ্য সংঘাত
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাত সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইয়েমেনের এডেন ও হাদরামাউত অঞ্চলে আমিরাত-সমর্থিত 'সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল' (STC)-এর ওপর সৌদি বিমান হামলা দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় বড় ধরনের আঘাত হানে।
এছাড়া সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফ (RSF) বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এবং লেবানন ইস্যুতে সৌদি ও ইরানের কৌশলের বিপরীতে আমিরাতের নিজস্ব অবস্থান রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করেছে।
ভারত-আমিরাত পরমাণু চুক্তির নেপথ্য বার্তা
সৌদি আরবের সঙ্গে এমন নাজুক সময়ে ভারতের সঙ্গে আমিরাতের এই চুক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে-
নিজস্ব ‘পাওয়ার ব্লক’ : সম্প্রতি ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার মিত্রতায় বড় ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে আমিরাত-পন্থি মিলিশিয়াদের ওপর সৌদি বিমান হামলা দুই দেশের সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। এমন অবস্থায় রিয়াদের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে ভারত ও ইসরায়েলের সাথে মিলে একটি নিজস্ব ‘পাওয়ার ব্লক’ তৈরি করছে আবুধাবি।
ইসরায়েল-ভারত-আমিরাত ত্রিভুজ বলয় : ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভারত ও ইসরায়েল ইতিমধ্যে কৌশলগত অংশীদার। এখন ভারতের সঙ্গে আমিরাতের এই প্রতিরক্ষা ও পরমাণু চুক্তি মূলত একটি শক্তিশালী ‘ইসরায়েল-ভারত-আমিরাত’ অক্ষ তৈরি করল। এটি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সৌদি আরবের একক আধিপত্য—উভয়কেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। শুধু তাই নয়, এখানে ইসরায়েল পর্দার আড়াল থেকে গোয়েন্দা তথ্য এবং উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করছে।
পাকিস্তান-সৌদি অক্ষের পাল্টা জবাব : সম্প্রতি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে 'স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট সই হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে এক দেশের ওপর আক্রমণ হলে অন্য দেশ পাশে দাঁড়াবে। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদির এই ঘনিষ্ঠতার জবাবে আমিরাত এখন ভারতের সঙ্গে পরমাণু ও সামরিক কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। এছাড়া ভারত এখন আমিরাতের বৃহত্তম জ্বালানি ক্রেতা এবং অন্যতম প্রধান সামরিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়ে পাকিস্তানকে বড় ধরণের কূটনৈতিক বার্তা দিল।
ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থ : ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, বিশেষ করে ওআইসি (OIC) ভুক্ত দেশগুলো কাশ্মীর ইস্যুতে বা দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে আসত। কিন্তু হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে মুসলিম প্রধান দেশ আমিরাতের এই গভীর সামরিক ও পরমাণু গাঁটছড়া প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ধর্মীয় সংহতির চেয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বলয়ে বৈচিত্র্য আনা : যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমিরাত এখন ভারতকে তাদের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বেছে নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা এই সম্পর্কের গভীরতাকেই স্পষ্ট করে।
পরমাণু শক্তিতে ভারতের প্রবেশ : পরমাণু অস্ত্রধারী ভারতের সাথে সিভিল নিউক্লিয়ার চুক্তি করা মানে মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর পরমাণু রাজনীতিতে ভারতকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা। এটি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিপরীতে এক ধরণের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা।
জ্বালানি নিরাপত্তার কৌশলগত পরিবর্তন
আমিরাত মূলত তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় (Vision 2031)। অন্যদিকে ভারতের বিশাল জ্বালানি চাহিদা রয়েছে। চুক্তির ফলে আমিরাত ভারতকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী এবং নির্ভরযোগ্য ‘এনার্জি কাস্টমার’ হিসেবে নিশ্চিত করল। আর পরমাণু প্রযুক্তিতে ভারতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে আমিরাত তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে কাজে লাগাতে চায়, যা দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইরান বিরোধী অদৃশ্য জোট
সৌদি আরব যখন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, আমিরাত তখন ইসরায়েল ও ভারতের সঙ্গে মিলে একটি ইরান-বিরোধী শক্তিশালী অক্ষ তৈরি করছে। ইসরায়েল চায় না ইরান পরমাণু শক্তি অর্জন করুক। তাই আমিরাত যখন ভারতের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করে, তখন সেটি ইরানের জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা—যে আমিরাতের পেছনেও পারমাণবিক শক্তিধর বন্ধু (ভারত) দাঁড়িয়ে আছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব মোকাবিলা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চীন খুব দ্রুত তাদের প্রভাব বিস্তার করছে (যেমন: ইরান-সৌদি সমঝোতা)। ভারত ও আমিরাতের এই গভীর প্রতিরক্ষা ও পরমাণু সহযোগিতা মূলত যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত একটি বিকল্প অক্ষ (Axis) তৈরির চেষ্টা। এই চুক্তির ফলে ভারত এখন আর শুধু দক্ষিণ এশীয় শক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় বড় অংশীদার হতে চায়।
থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক মিডল ইস্ট আই ও স্টিমসন সেন্টারের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন আর ধর্মীয় ঐক্য বা আরব জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। আমিরাত নিজেকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে ভারতের মতো স্থিতিশীল অর্থনীতির সাথে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।
এদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টার (Stimson Center) এবং চ্যাথাম হাউস (Chatham House)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখন আর এককেন্দ্রিক নেই। সৌদি আরব যখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা খুঁজছে, আমিরাত তখন ভারত ও ইসরায়েলের মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে মিলে একটি প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নির্ভর 'বিকল্প অক্ষ' শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিভাজন বাংলাদেশের শ্রমবাজার এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার এই ঠান্ডা লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে ঢাকাকেও তার বৈদেশিক নীতিতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হতে পারে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা, টাইমস অব ইন্ডিয়া, চ্যাথাম হাউস রিপোর্ট এবং ভারত ও আমিরাত সরকারের যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (জানুয়ারি ২০২৬)




