দেশে মবতন্ত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। নানা ইস্যুতে মব তৈরি করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার সংস্কৃতি যেন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। গত মে মাসে সারা দেশে মব সৃষ্টি করে ৩১ ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৬৮ জনের মতো গুরুতর আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিক খবরের বরাতে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) মে মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে মে মাসে রাজনৈতিক সহিসংতায় ৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ছাড়া নারী নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনার কথা বলা হয়েছে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে সারা দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৬টি ঘটনায় গণপিটুনিতে ৩১ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন ৬৮ জন। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে সারা দেশে রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দলে ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা এপ্রিল মাসের তুলনায় কমেছে। গত এপ্রিল মাসে ৯৮টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৩ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মে মাসে ৬৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১১৪ জন। ১০টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৯ জন ও নিহত হয়েছেন ১ জন, ১৪টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭২ জন ও নিহত হয়েছেন ২ জন। ২টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২ জন, ১১টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২৭ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন। এ ছাড়া, ২টি ঘটনায় ইউপিডিএফের ২ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১ জন, জামায়াতের ১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের ২ জন ও একজন সাধারণ মহিলা।
‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তর্কোন্দল, ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছ’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৫টি ঘটনায় কমপক্ষে ৭ জন আহত এবং ১ জন নিহত হয়েছেন। অন্তত ১১ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক ৮টি ঘটনায় অন্তত ১৩৪টি বাড়ি-ঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
মে মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৮ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৯ জন সাংবাদিক। ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ২টি মামলায় ৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৮ মে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খাল এলাকায় বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জন ও মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, এ মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামি মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন কয়েদি ও ৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ১ জন আওয়ামী লীগের, ৬ জন সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৬টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তা ছাড়া বিএসএফ কর্তৃক ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪টি ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করেছেন আরাকান আর্মি। শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে ৫৭টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০ জন এবং আহত হয়েছেন ১৩০ জন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৪১ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন।
৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৮৩ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তন্মধ্যে শিশু ৪২ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৪ এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৩ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৫ জন নারী। এ ছাড়া, অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন। অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, অন্তত ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২১১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন