আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় ঘটনার দশম বার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিনে রাজধানীর গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত হয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। কয়েক ঘণ্টার সেই রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞ শুধু বাংলাদেশকেই স্তব্ধ করেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের নাম। প্রশ্ন উঠেছিল দেশের নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সক্ষমতা এবং উগ্রবাদের বিস্তার নিয়ে।
এক দশক পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্র জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নির্মূল বা গ্রেপ্তার হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়াও অনেক দূর এগিয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে কিছু জঙ্গি নেতা ও সদস্যের জামিনসহ নানা ফাঁক-ফোকরে মুক্তি দিয়েছে, এটিও অস্বীকারের কোনো উপায় নেই।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদার মতে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কারণ উগ্রবাদ কখনো একই রূপে ফিরে আসে না, বরং সময়ের সঙ্গে কৌশল ও মাধ্যম বদলায়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই, রমজানের এক শুক্রবার। রাত প্রায় পৌনে ৯টা। গুলশানের লেকভিউ রোডের হলি আর্টিজান বেকারিতে তখন দেশি-বিদেশি অতিথিদের ভিড়। ঠিক সেই সময় নিষিদ্ধঘোষিত নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য অস্ত্র, গ্রেনেড ও ধারালো চাপাতি নিয়ে রেস্তোরাঁটিতে হামলা চালায়। মুহূর্তেই একটি সাধারণ রাত পরিণত হয় রক্তাক্ত বিভীষিকায়। জঙ্গিরা বিদেশি নাগরিকসহ উপস্থিত অতিথিদের জিম্মি করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণে শহিদ হন বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম।
সারা রাত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটে দেশবাসীর। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ২ জুলাই সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং জীবিতদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
হলি আর্টিজানে হামলায় প্রাণ হারান ২০ জন জিম্মি। তাদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং দুজন বাংলাদেশি নাগরিক। এর সঙ্গে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে যোগ করলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।
স্বজনদের কাছে সেই ক্ষত আজও তরতাজা। ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবার এখনো সেই রাতের স্মৃতি ভুলতে পারেনি। নিহতদের অনেকের বাবা-মা, স্ত্রী কিংবা সন্তান আজও প্রশ্ন করেন, কেন এমন নির্মম মৃত্যুবরণ করতে হলো তাদের প্রিয়জনকে?
হামলার পরপরই দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস। তবে তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে, হামলাটি ছিল দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির পরিকল্পিত অপারেশন।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তদন্তে উঠে আসে, কয়েক মাস ধরে গোপনে হামলার প্রস্তুতি চলছিল। রাজশাহী, গাইবান্ধা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয় জঙ্গি আস্তানা। হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও সমন্বয়কারীদের ভূমিকার তথ্যও উদ্ঘাটিত হয় তদন্তে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, হামলার পরিকল্পনা এতটাই গোপনীয় ছিল যে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হামলাকারীদের কাছেও পুরো অপারেশনের সব তথ্য দেওয়া হয়নি।
হামলার পর গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিটিটিসি। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদ- দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট সেই সাজা পরিবর্তন করে সাতজনকে আমৃত্যু কারাদ- দেন। আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ। অপর দ-প্রাপ্ত আসলাম হোসেন পরে কারাগারে নিহত হন। ২০২৫ সালের জুনে এ বিষয়ে প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ বিশ্লেষণ, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা এবং আসামিদের জবানবন্দির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে নব্য জেএমবিই এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিল।
হলি আর্টিজানে হামলার পর দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সিটিটিসি, র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা নিহত বা গ্রেপ্তার হন। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য জঙ্গি আস্তানা। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও উগ্রবাদী প্রচারসামগ্রী। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি, সাইবার মনিটরিং, অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তথ্যবিনিময় বাড়ানো হয়। কূটনৈতিক এলাকা, বিদেশি মিশন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থাও নতুন করে সাজানো হয়।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুকের মতে, হলি আর্টিজানে হামলা বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। জঙ্গিদের বড় ধরনের সাংগঠনিক হামলা চালানোর সক্ষমতা অনেকটাই কমেছে। কিন্তু অনলাইন উগ্রবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি এবং ‘লোন উলফ’ বা একক হামলার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। তার ভাষায়, জঙ্গিবাদ কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি আদর্শিক চ্যালেঞ্জ। তাই শুধু অভিযান চালিয়ে নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই উগ্রবাদ প্রতিরোধ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হলি আর্টিজানে হামলার এক দশক পূর্তিতে বাংলাদেশ যেমন জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সাফল্যের গল্প বলতে পারে, তেমনি সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জও। কারণ জঙ্গিবাদ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি চলমান আদর্শিক লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আইনের শাসন, সামাজিক সচেতনতা এবং তরুণদের ইতিবাচক সম্পৃক্ততা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ১০ বছর পরও হলি আর্টিজানের সেই রক্তাক্ত রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন