একসময় যে নদীর পানিতে মানুষ গোসল করত, রান্না করত, আজ সেই রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে দাঁড়ানোই দায়। তীব্র দুর্গন্ধ, ময়লা পানি, ভাসমান প্লাস্টিক, বাজারের আবর্জনা আর শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে খুলনার এই দুই নদী ধীরে ধীরে প্রাণ হারাচ্ছে। কমে যাচ্ছে মাছের উৎপাদন, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য, আর নদীনির্ভর হাজারো মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে রূপসা-ভৈরব শুধু দূষিত নদী নয়, কার্যত মৃত নদীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহানগরের বিভিন্ন ড্রেন দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য, বাজারের ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক ও পলিথিন। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই দূষণের ফলে নদীর পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে।
জেলে আব্দুল মালেক বলেন, আগে ভোরে নদীতে জাল ফেললেই টেংরা, চিংড়ি, পাবদাসহ নানা ধরনের মাছ মিলত। এখন সারা দিন নদীতে থেকেও খরচ ওঠানোর মতো মাছ পাওয়া যায় না। নদীর পানি দূষিত হওয়ায় মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
নৈহাটি বাজার এলাকার মাছ ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা বলেন, দেশীয় নদীর মাছের চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকে। কিন্তু স্থানীয় নদী থেকে পর্যাপ্ত মাছ না আসায় বাইরে থেকে মাছ আনতে হচ্ছে। এতে দামও বাড়ছে, ক্রেতারাও ভালো দেশীয় মাছ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নৈহাটি এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, নদী শুধু জেলেদের জীবিকার উৎস নয়, পুরো এলাকার পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। দূষণের কারণে মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রবীণ জেলে নূর ইসলাম বলেন, নদীর যে চেহারা আমরা ২০-২৫ বছর আগে দেখেছি, এখন তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। শিল্পবর্জ্য আর নানা ধরনের ময়লা নদীতে পড়তে পড়তে মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীতে মাছ পাওয়াই কঠিন হবে।
রূপসা নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা হালিমা খাতুন বলেন, ছোটবেলায় এই নদীর পানি অনেক পরিষ্কার ছিল। এখন পানির রং কালচে হয়ে গেছে, মাঝে মাঝেই তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। আগের মতো নদীর ধারে বসে সময় কাটানোর পরিবেশও আর নেই।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করা, সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নিশ্চিত করা, নগরের আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাল-নদী দখলমুক্ত রাখা এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ নেই। রূপসা ও ভৈরব নদ-নদী শুধু দুটি জলধারা নয়, এ দুটি নদ-নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খুলনার পরিবেশ, অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই নদীগুলোকে জীবিত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরবর্তী শিল্প-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারের বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। পাশাপাশি খাল দখল ও ভরাটের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে দূষণ আরও বাড়ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান বলেন, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক, বাজারের আবর্জনা, শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক নদীর পানি দূষিত করছে। এসব দূষণের বিষাক্ত উপাদান মাছের শরীরে জমে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান (মুকুল) বলেন, শিল্পবর্জ্য, নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে প্রবাহিত পয়োবর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণই নদীর প্রধান শত্রু। তার মতে, রূপসা নদী রক্ষায় এখনো দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে দূষণ ও দখল দুই সংকটই ক্রমে গভীর হচ্ছে।
খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, প্রতি মাসে নদীর পানির মান পরীক্ষা করা হয়। বর্ষায় পানির মান সাধারণত গ্রহণযোগ্য থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা অনেক ক্ষেত্রে মানদ-ের নিচে নেমে যায়। তিনি বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নদীদূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) খুলনা নদীবন্দরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, আমাদের কাছে নদীতীরবর্তী ৯০০টিরও বেশি অবৈধ স্থাপনার তালিকা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত করে পর্যায়ক্রমে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন