× UCB Sticker Card
রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ব্যুরো

প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যার ভয়াল থাবা

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ব্যুরো

প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যার ভয়াল থাবা

টানা পাঁচ দিনের ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রামের অন্তত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মানুষ এখনো পানিবন্দি। পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নারী এবং শিশুসহ অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়ে সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

দুর্গত মানুষের অভিযোগ, বন্যার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। জেলা প্রশাসনের বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তা ছাড়া অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলাসমান পানি থাকায় ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ত্রাণই ভরসা বন্যাকবলিত মানুষের।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে দুজন, বাঁশখালীতে তিনজন, সীতাকু-, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও সাতকানিয়ায় একজন করে রয়েছেন। অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, সীতাকু- ও সন্দ্বীপে বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে সাঙ্গু, ডলু ও শঙ্খসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করায় একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে আবার বাড়ি ছাড়তে না পেরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কাঁচাঘর ধসে পড়ে গেছে। ফলে গৃহহীন হয়ে পড়েছে অধিকাংশ মানুষ। সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। লোহাগাড়ায় মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চন্দনাইশের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি ও সীতাকু-ের বিভিন্ন এলাকাও বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, অধিকাংশ পরিবারের রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আবার অনেকের ঘরেই খাবার নেই। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাঁশখালীর কাথরিয়া, ছনুয়া, গ-ামারা, রতœপুর ও সরল ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বন্যায় হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও অন্যান্য ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের, পুকুরের মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য। অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা ঘর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও ছোট সেতু। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় বহু এলাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। উপজেলার জন্য ৪৫ টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বাঁশখালী উপজেলায় মোট ৮৬টি স্লুইসগেট রয়েছে, তার মধ্যে বর্তমানে ৭১টি চালু রয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে হঠাৎ পানি বেড়ে গেছে। অনেক জায়গায় মানুষ বেড়িবাঁধ কেটে দিচ্ছে দ্রুত পানি কমে যাওয়ার জন্য।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চট্টগ্রামের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩ লাখ টাকা ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা দ্রুত বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া ৭০০ টন চালের মধ্যে ৪০০ টন বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৩০০ টন চাল বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার টু ডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফ জাহান সিকদার বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কক্সবাজারে ৭ দিনে প্রাণহানি ২৭, পানিবন্দি তিন লাখ মানুষ : টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি কক্সবাজারে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। গত সাত দিনে পানিতে ডুবে, নৌকাডুবি ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলা। এ ছাড়া চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি,  কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান পেকুয়া উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণ ও ওষুধসামগ্রী বিতরণ করেন। একইদিন কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ লুৎফুর রহমান কাজল তিনটি উপজেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকা ঘুরে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি মানবিক সহায়তা বিতরণ করেন।

শনিবার জেলা প্রশাসক পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাংলাপাড়া গ্রামে গিয়ে পানিবন্দি মানুষের খোঁজখবর নেন এবং তাদের হাতে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ তুলে দেন। এ সময় পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য আলহাজ লুৎফুর রহমান কাজল শনিবার সকাল থেকে রামুর মিঠাছড়ি ও রাজারকুল, ঈদগাঁওয়ের বংকিম বাজার, মাইচপাড়া ও ঈদগাঁও বাজার এবং সদর উপজেলার চৌফলদ-ীসহ বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো ঘুরে দেখে তিনি দুর্গত পরিবারগুলোর হাতে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন এবং পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।

এদিকে, মৃত্যুর মিছিলও থামছে না। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে ঈদগাঁওয়ের গজালিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে  নিখোঁজ শিশু সাজেদের মরদেহ। গত চার দিন আগে ঢলে পানিতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হন সাজেদ। এর আগে শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়। তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জনের প্রাণহানি ঘটে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যার কারণে বহু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে। প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার এবং ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।

বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন : বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানান বান্দরবান সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন।

শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লা বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া শুক্রবার রাতে বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে গেছে। এতে দুই জেলার সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে পড়েছে।

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকার লামায় ৩০০ পরিবার, নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০০ পরিবার এবং সদর উপজেলার গোয়ালিখোলা এলাকায় ২৬৫ পরিবারকে ৮৮৫ টাকার একটা ত্রাণ প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ প্যাকেজে ছিল চাল, ডাল, চিনি, গুড়, লবণ, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!