দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রভাবে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন নি¤œাঞ্চলে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়া চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা। এদিকে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও। সশস্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বন্যায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, গতকাল শনিবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানাধীন বিজয় নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদ্রাসা, নারিকেল তলা ও নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে নৌবাহিনী দল। এ সময় পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে নৌবাহিনীর সদস্যরা ২ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার পৌঁছে দেয়। মানবিক দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন : এদিকে চট্টগ্রাম জেলায় ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আইএসপিআর জানিয়েছে, টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীÑ এই ৪টি উপজেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে এসব এলাকার প্রায় ৪ লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন কর্তৃক দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ভারি মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলাতেও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই উপজেলাগুলোতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সেনাসদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই অঞ্চলগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের জন্য নিরলসভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত এবং সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২৪ পদাতিক ডিভিশন ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বরাবরের মতোই দেশের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় বদ্ধপরিকর। দুর্গত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনীর এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বান্দরবানে বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে বিজিবি : এদিকে বিগত কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টির ফলে বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বান্দরবান জেলা শহরের সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলার বিশেষ করে রোয়াংছড়ি উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে এবং ধ্বংসাবশেষ জমে মূল সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে জনসাধারণ চরম দুর্ভোগে পড়ে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর বান্দরবান সেক্টর সদর দপ্তরের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। বিজিবি সদস্যরা নিরলস প্রচেষ্টায় সড়কে উপড়ে পড়া গাছ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে বান্দরবানের সাথে আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করেন। যার ফলে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
শুধু সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারেই নয়, গাছ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি মেরামতের কাজেও বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত সহায়তা প্রদান করছেন। দ্রুত বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার লক্ষ্যে এই যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির তাৎক্ষণিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিজিবি সদস্যদের দায়িত্বশীল পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে এবং জনদুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে জনগণের পাশে থেকে দায়িত্ব পালনে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বান্দরবানে বিজিবির মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
রাঙামাটিতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা : জানমাল রক্ষায় মাঠে আনসার ও ভিডিপি : আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তর জানিয়েছে, পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে কয়েক দিনের টানা বর্ষণে দেখা দিয়েছে তীব্র ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়ে আনতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেওয়ার আগেই গত ২৯ জুন রাঙামাটি জেলা কমান্ড্যান্টের কার্যালয়ে উপজেলা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাতাভোগী ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢালু ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসনের চিহ্নিত করা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে তৎপর হয়ে ওঠেন আনসার ও ভিডিপির তৃণমূল সদস্যরা। চলমান ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার কয়েকদিন পূর্ব থেকেই পাহাড়ি জনপদগুলোতে দলবেঁধে সতর্কতামূলক প্রচার চালান তারা। স্থানীয় প্রশাসন ও উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনায় বাহিনীটির সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে পাহাড়ধসের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে শুরু করেন। একই সঙ্গে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে সবাইকে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।
আনসার ও ভিডিপি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার রাঙামাটি জেলা সদরের প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিপন্ন মানুষের পাশে থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেই রাত জাগছেন বাহিনীর সদস্যরা। পাহাড় ধস ও ফ্ল্যাশ ফ্লাডের চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এখনো যারা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছেন, তাদের জীবন বাঁচাতে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা। তীব্র দুর্যোগের মধ্যেই কাঁধে হ্যান্ড মাইক নিয়ে তারা ছুটে যাচ্ছেন পাহাড়ের পাদদেশে থাকা প্রতিটি ঘরে ঘরে। অনতিবিলম্বে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার জন্য বাসিন্দাদের পুনরায় অনুরোধ ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
রাঙামাটিসহ দেশের সব বন্যাকবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বলেন বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে তাদের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দুর্গত মানুষের উদ্ধার, সতর্কীকরণ এবং সর্বাত্মক সহায়তা করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে ব্যাটালিয়ন পরিচালক, জেলা কমান্ড্যান্ট এবং উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তাগণ নিজেরা সরাসরি উপদ্রুত এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি ও সমন্বয় করে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন