গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনা আসা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে লেনদেন হওয়া বিপুল অর্থের উৎস ও সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে পুলিশের আবেদনের পর এ আদেশ দেওয়া হয়।
গতকাল সোমবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেনের আদালত এই আদেশ দেন। এর আগে আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) কে এম রাকিবুল হুদা।
এদিকে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনকভাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট।
গতকাল সোমবার সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের বৈধ কোনো আয়-উৎসের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা এবং প্রায় একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য মিলেছে, যা সন্দেহজনক বলে মনে করছে সিআইডি।
এর আগে গত রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকার সিআইডির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের কোমরপুরের মধ্যরামচন্দ্রপুর (নয়াপাড়া) গ্রামের মৃত গোপিনাথ চন্দ্র তরনী দাসের ছেলে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস একজন সাধারণ ব্যবসায়ী এবং তিনি ব্যবসার আড়ালে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচারসহ হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আসামির ব্যাংক হিসাবসমূহে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবসমূহে ব্যবসা বহির্ভূত নগদ অর্থ জমা করা হয়েছে। অভিযোগটির অনুসন্ধানে তার নামে ৫টি ব্যাংক হিসাব ও ৪টি এমএফএস হিসাবে বিভিন্ন সন্দেহজনক উৎস থেকে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৪৫১ টাকা জমা হওয়ার রেকর্ডপত্রভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়। এই জমাকৃত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের সম্পৃক্ত অপরাধ প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়।
সার্বিক অনুসন্ধানে সংগৃহীত তথ্য প্রমাণ, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যাংকিং ডকুমেন্টস ও অন্য তথ্যাদি বিশ্লেষণে জানা যায়, অভিযুক্ত শ্রী হরিদাস অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র পরস্পর যোগসাজশে হুন্ডি তথা ‘দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার করত’। সর্বমোট ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৪৫১ টাকা অপরাধলব্ধ অর্থ অর্জনসহ অর্জিত টাকা ও রূপান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫) এর ২ (শ) এ৫ (১৪) ও (২৬) ধারা অনুসারে সম্পৃক্ত অপরাধ। ওই ঘটনায় অর্গানাইজড ক্রাইম (ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম) সিআইডির পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
জানা যায়, হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস আর্থিক সংকটের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ-ি পেরোতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময় শূকর পালন, বাঁশের তৈরি ডালি-কুলা বিক্রি এবং শ্যালো মেশিন চালানোর কাজ করেন। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভারতে চলে যান। ২০১০ সালে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় বসবাস শুরু করে পুরোনো এসি মেরামত ও বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ধর্ম পরিবর্তন করে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ধারণ করেন এবং ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। চাকরি, বদলি, টেন্ডার এবং উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর ভুয়া পরিচয়ে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি এবং প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফিরে পুনরায় বিভিন্ন কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েন।
এরপরে দেশে ফিরে পলাশবাড়ীর মধ্য রামচন্দ্রপুরের পুরোনো শিব ও কালীমন্দিরের স্থানে ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির’ নির্মাণকাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুতে ৮১ ফুট উচ্চতার এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। পরে মূর্তির অর্থায়নের উৎস, জমির মালিকানা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয় নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একাধিক ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এর প্রতিবাদ জানায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গত ১১ জুন শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কর্তৃপক্ষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে রামমূর্তি নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন