ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল শনিবার তৃতীয় দফা সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সিজেপির বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
সরকারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার পর সিজেপির প্রতিনিধিরা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত জানান। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব এফআইআর (মামলা) প্রত্যাহার করা হবে বলে সরকার আমাদের নিশ্চিত করেছে।
সরকারের সঙ্গে তিন দফার আলোচনা শেষে সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, আমরা সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিন দফায় আলোচনা করেছি। যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা আমাদের আন্দোলনের তিনটি প্রধান দাবি ছিল : প্রথমত, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ; দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারী ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে রুজু করা সব আইনি মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহার করা এবং ভবিষ্যতে কোনো মামলা না দেওয়া; আর তৃতীয়ত, নিট পরীক্ষা না হওয়ার কারণে যাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছি, সেইসব পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করায় আমাদের প্রথম দাবিটি পূরণ হয়েছে।
সিজেপি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সরকারের সঙ্গে আরও এক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে টানা ৩৬ দিনের তীব্র আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে ইস্তফা দেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আন্দোলনকারীরা এ ঘটনাকে একটি ঐতিহাসিক জয় হিসেবে দেখলেও সিজেপি সরকারের কাছে আরও তিনটি দাবি পেশ করে। দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি সভাপতি অভিজিৎ দিপকে জানান, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলনের শুধু একটি ধাপ। তিনি আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ বিচার পেতে হলে সরকারকে নি¤œলিখিত দাবিগুলো মেনে নিতে হবেÑ
আর্থিক ক্ষতিপূরণ : পরীক্ষায় অনিয়ম ও মানসিক চাপের কারণে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের পরিবারকে অন্তত ১ কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পুলিশি হিংসার বিচার : গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় যেসব পুলিশ সদস্য শিক্ষার্থীদের ওপর চরম বর্বরতা চালিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
মামলা প্রত্যাহার : ২০ জুলাই বা তার পর থেকে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হলেও আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের সংগ্রাম এখানেই শেষ নয়। শিক্ষার্থীদের দাবির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে উল্লেখ করে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ককরোচ জনতা পার্টি জানায়, বাকি দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
যন্তর মন্তরে উৎসবের পরিবেশ : শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা প্রকাশের পর রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা গান গেয়ে এবং স্লোগান তুলে নিজেদের বিজয় উদযাপন করেন। আন্দোলনস্থলে মানুষের উপস্থিতিও দ্রুত বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীদের মতে, দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ ও ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এ সময় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য মিষ্টি বিতরণ করে শিক্ষার্থীর ও যুবকরা।
এর আগে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের চার দফা দাবির মধ্যে একটি পূরণ হয়েছে। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়াসহ বাকি দাবিগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দীপকের পদত্যাগ-পরবর্তী উদযাপনের একটি ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছে, ‘গণতন্ত্রের জয় হয়েছে।’ এর আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, আপনি যদি ভয় না পান, এই সরকারের সামনে মাথা নত না করেন, তাহলে যে কারো পদত্যাগ আদায় করা সম্ভব। গণতন্ত্রে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তিনি বলেন, ‘এটি প্রথম উইকেট। আমরা এখানেই থামব না। এটি কেবল শুরু।’ গত ৩৬ দিন ধরে যন্তর মন্তরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দীপকে বলেন, ‘আমি সব শিক্ষার্থী এবং গত ৩৬ দিন ধরে এখানে অবস্থান করা সব স্বেচ্ছাসেবককে স্যালুট জানাই।’ দ্য হিন্দু বলছে, তার এই মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরও আন্দোলনকারীরা তাদের বাকি দাবিগুলো আদায়ের লক্ষ্যে কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘোষণাকে শান্তি, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুক। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), জেন-জি তরুণদের এবং দেশের নাগরিকদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘সিজেপি, দেশের জেন জেড এবং দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ভয় ও ভয়ের সংস্কৃতি ঝেড়ে ফেলে যারা প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।’ তিনি আরও বলেন, ‘জবাবদিহি নিশ্চিত করার লড়াইয়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছি। এখন সময় সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।’ ওয়াংচুকের মতে, এই আন্দোলনের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু দায় নির্ধারণ নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।
ভারতের তরুণদের বিজয় : কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেনুগোপাল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে ভারতের তরুণদের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘তরুণদের শক্তিই অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দায়ী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এটি জনগণের জয় এবং জবাবদিহির দাবিতে লড়াই করা সবার বিজয়।’ বেনুগোপাল বলেন, ‘নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই কংগ্রেস, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী, তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীদের বাকি দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা।
ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শরদ পাওয়ারও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে ‘তরুণদের শক্তির বড় বিজয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ২৮ দিন ধরে তরুণদের যে সংগ্রাম ও দৃঢ়তা দেখা গেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’ তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের দৃঢ় দাবির মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। ভয়কে উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই লড়াই সরকারকে নৈতিক দায় স্বীকারে বাধ্য করেছে। এটি গণতন্ত্রের শক্তির প্রতীক এবং দেশের তরুণদের ঐক্যের বড় বিজয়।’
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ সব দাবি মেনে নেওয়ায় ভারতের তরুণদের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তারা জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছিল। বিরোধী নেতাদের মতে, এই পদত্যাগ ও সব দাবি মেনে নেওয়ায় প্রমাণ করেছে যে, ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায় করা সম্ভব।
পদত্যাগপত্রে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য : পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। দেশের তরুণ সমাজ যেন বিভ্রান্ত না হয়, কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতায় না পড়ে এবং দেশের ঐক্য অক্ষুণœ থাকেÑ এসব বিবেচনায় নিয়েই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর সরকার দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করেছে, পুনঃপরীক্ষা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল আন্দোলন : গত মে মাসে চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা এবং কয়েকটি সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। পরে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই মন্তব্যের প্রতিবাদে বহু তরুণ নিজেদের প্রতীক হিসেবে ‘তেলাপোকা’ পরিচয় গ্রহণ করেন। সেই প্রেক্ষাপটে ককরোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সমর্থন অর্জন করে। পরবর্তীতে আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রধান দাবিতে পরিণত হয়।
ভারত সরকারের পদক্ষেপ : আন্দোলনের চাপের মুখে সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার, আইন আরও কঠোর করা, শিক্ষা সচিবকে অপসারণ এবং পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার বহু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার মতো একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেয়। আন্দোলনকারীদের কয়েকটি দাবিও নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয়। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে প্রথমে কোনো সমঝোতা না হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেন। সবশেষে গতকাল শনিবার তৃতীয় দফা সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সিজেপির বৈঠকের পর ছাত্রদের সব দাবি মেনে নেওয়ায় আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন