পর্যাপ্ত যোগ্যতার অভাব, জোড়াতালির ক্যারিয়ার আর বিতর্কিত অতীতÑ সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) সর্বোচ্চ পদে বসতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ড. মো. শফিউল্লাহ মজুমদার কিরণ। অভিযোগ উঠেছে, ক্যাম্পাসের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের টপকে উচ্চপর্যায়ের জোর তদবির চালিয়ে সিকৃবির ভিসি পদ বাগিয়ে নিতে চলেছেন অপেক্ষাকৃত এই জুনিয়র শিক্ষক। অনৈতিক উপায়ে একজন বহিরাগত ও বিতর্কিত জুনিয়রকে এই পদে বসানোর খবরে ক্যাম্পাসজুড়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ভিসি সার্চ কমিটি ইতোমধ্যেই তার নাম চূড়ান্ত করে এনেছেÑ এমন খবরে ক্যাম্পাসজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে সিকৃবির ভিসি হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান প্রফেসর ড. মো. আলিমুল ইসলাম। অল্পদিনের মধ্যে তিনি নানা অনৈতিক কাজের জন্য সমালোচিত হয়ে পড়েন।
সাতটি অনুষদের আওতাধীন ৪৭টি বিভাগে অধ্যয়নরত ৩ হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় ৬০০ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর এই বিদ্যাপীঠে এখন একটাই প্রশ্নÑ কে হচ্ছেন সিকৃবির পরবর্তী ভিসি। ক্যাম্পাসের একটি অংশ বর্তমান ভিসির মেয়াদ পূর্ণ করার পক্ষে হলেও সর্ববৃহৎ অংশটি বিএনপির আদর্শে পরিচালিত শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর সভাপতি ও ফার্মাকোলজি এবং টক্সিকোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুল ইসলামকে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিসি হিসেবে দেখতে চান। পাশাপাশি প্যাথলজি বিভাগের প্রফেসর ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং নিউট্রিশন বিভাগের প্রফেসর ড. এমদাদুল হকের নামও ভিসি পদের দৌড়ে জোর আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু এই অভ্যন্তরীণ জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে পাশ কাটিয়ে আওয়ামী মতাদর্শী কতিপয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একটি বিশেষ আঞ্চলিক গোষ্ঠীর ইন্ধনে বাইরের এক বিতর্কিত শিক্ষককে বসানোর ষড়যন্ত্র চলছে।
অনুসন্ধানে শফিউল্লাহ মজুমদার কিরণের সিভি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তার পুরো ক্যারিয়ারই শুভঙ্করের ফাঁকি ও জালিয়াতিতে ভরা। সিভিতে অনার্স, এমএস, পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার কথা উল্লেখ থাকলেও এসএসসি ও এইচএসসি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করেছেন বা কী ফল ছিল, তা উল্লেখ করার ন্যূনতম সাহসও পাননি তিনি। ১৯৯৩-৯৪ সেশনে বাকৃবির অধিভুক্ত পটুয়াখালী কৃষি কলেজ থেকে ২০০০ সালে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি পাস করার পর ২০০১ সালে বিলুপ্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) এমএসে ভর্তি হন এবং ২০০৩ সালে সিজিপিএ ৩.৮৭ পান। পরবর্তীতে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হলে তার এমএস সুপারভাইজর ড. এ কে এম আব্দুল হান্নান ভূঁইয়া ভিসি হন এবং তার অনুকম্পায় ২০০৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর লেকচারার পদে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পান শফিউল্লাহ। পরবর্তীতে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে ভিসি হান্নান ভূঁইয়ার পদত্যাগের পর রাতের আঁধারে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে ঢাকায় পালিয়ে আশ্রয় নেন এই কিরণ।
ঢাকায় এসে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ৩০ মে পর্যন্ত পার্টটাইম লেকচারার হিসেবে কাজ করার পর একই বছরের ৩১ মে স্থায়ী পদ পান। পরবর্তীতে ২০১০ সালে চীনের জিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন এবং ৩০ মার্চ ২০১৮ তারিখে প্রফেসর পদে পর্যায়োন্নয়ন পান। সিভিতে তিনি ২২ বছরের শিক্ষকতার চটকদার দাবি করলেও পার্টটাইম সময় বাদ দিলে তার প্রকৃত শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা মাত্র ১৯ বছর, যার মধ্যে অধ্যাপক পদে কাজের অভিজ্ঞতা মাত্র ৮ বছর। অথচ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনেই স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, ভিসি হতে হলে ন্যূনতম ২০ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতাসহ সিনিয়র অধ্যাপক হতে হবে, যা শফিউল্লাহর নেই।
সিকৃবিতেই ড. ছিদ্দিকুল ইসলাম, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও ড. এমদাদুল হকের মতো শতাধিক প্রবীণ, দক্ষ ও যোগ্য অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে একজন অপটু ও অযোগ্য জুনিয়রকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অযোগ্যতা ও ক্লাসে ঠিকমতো পড়াতে না পারার অভিযোগে পটুয়াখালী থেকে পালিয়ে আসা এই বিতর্কিত ব্যক্তি সিকৃবির মতো ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মসনদে বসলে বিদ্যাপীঠটির শিক্ষার পরিবেশ ধসে পড়ার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক ও কর্মকর্তারা ফুঁসে উঠতে পারেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন