মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান একটি নতুন তিন ধাপের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার অবসান ঘটানো। এই প্রস্তাব ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি হতে পারে বলে তেহরান আশাবাদী।
প্রথম ধাপ- পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা : ইরানের প্রস্তাবের প্রথম ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি। তেহরান স্পষ্টভাবে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শুধু বর্তমান হামলা বন্ধ করলেই হবে না, বরং ভবিষ্যতেও ইরান ও লেবাননের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই দাবির মাধ্যমে ইরান মূলত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে, যা কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতির বাইরে গিয়ে একটি স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ধাপ বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন, কারণ পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো তীব্র।
দ্বিতীয় ধাপ- হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা : প্রথম ধাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করবে আলোচনা। এই পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, এই প্রণালির নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু করা হবে। প্রসঙ্গত, যুদ্ধের সময় ইরান এই প্রণালিতে কার্যত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। এতে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তৃতীয় ধাপ- পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা : প্রস্তাবের শেষ ধাপে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে, প্রথম দুই ধাপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে তারা এই সংবেদনশীল ইস্যুতে আলোচনায় বসবে না। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ইরান পারমাণবিক ইস্যুকে একটি কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। ওয়াশিংটন বারবার বলছে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্ক ও সংযত প্রতিক্রিয়া : ইরানের তিন স্তরের প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রকাশ্যে আলোচনা করা হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি দীর্ঘ কূটনৈতিক সফরের পরিবর্তে সরাসরি যোগাযোগ, বিশেষ করে টেলিফোনে আলোচনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তিনি আরও বলেন, যেকোনো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে।
পূর্ববর্তী আলোচনা ও অচলাবস্থা : এর আগে ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। ওই বৈঠকে ব্যর্থতার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরকে দায়ী করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবি ও কঠোর অবস্থানের কারণেই আলোচনা সফল হয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরান এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নেয়নি।
কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার : বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ইরান ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। আরাগচি এরই মধ্যে পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়া সফর করেছেন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে ইরান, যাতে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক সমর্থন গড়ে তোলা যায়।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি : বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করলেও বর্তমানে তা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং প্রযুক্তিপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে দ্বন্দ্ব : ইরান দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে, এই কর্মসূচির আড়ালে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এই দ্বন্দ্বই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সহিংসতা : মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান যেন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন কমায়। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, এসব গোষ্ঠী নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য লড়াই করছে।
সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা : ইরানের তিন ধাপের প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হলেও এর বাস্তবায়ন অনেক চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পারস্পরিক অবিশ্বাস, পারমাণবিক ইস্যুতে মতপার্থক্য এবং আঞ্চলিক সংঘাতÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল রয়ে গেছে। তবে এই প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, যা সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কতটা নমনীয়তা দেখাতে পারে এবং এই প্রস্তাব বাস্তব কোনো সমাধানে রূপ নেয় কি না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন