বিশ্ববাজারে অস্থিরতার দাবিতে গত এপ্রিলে পরপর দুবার বাড়ানো হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) দাম। এতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত মার্চের তুলনায় মোট ৫৯৯ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা চলতি মে মাসেও অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু খোদ মিলগেটেই মানা হচ্ছে না বিইআরসির নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার। যেদিন বিইআরসি নতুন দাম ঘোষণা করে, সেদিন আমদানিকারকেরা মিলগেটে ১২ কেজির দর ঘোষণা করে ২ হাজার ৫০০ টাকা। বিইআরসির হিসাব অনুযায়ী (ডিস্ট্রিবিউটর) পাওয়ার কথা ১ হাজার ৯০০ টাকা দরে। এরপর কমিশন এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ধরে ভোক্তা পর্যায়ে তা ১ হাজার ৯৪০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদেরই ১ থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি দরে কিনতে হচ্ছে মিলগেট থেকে। ফলে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকারনির্ধারিত দরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব নয়। এমনকি তারা বলছে, ২ হাজার ৫০০ টাকার নিচে একটি সিলিন্ডার বিক্রি করলে তাদের কোনো লাভই হবে না। এতে করে চাপে পড়তে হচ্ছে ভোক্তাদের। সরকারনির্ধারিত দামের চাইতে প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দরে কিনতে হচ্ছে একেকটি সিলিন্ডার। ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজারে এতে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিন ধরেই কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামের চাইতে অনেক বেশি দাম আদায় করে নিচ্ছে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত একেকটি সিলিন্ডারে। বিইআরসি নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই উৎপাদনকারী কোম্পানিসহ খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা ভোক্তাদের জিম্মি করে আদায় করছেন অতিরিক্ত অর্থ। একেকটা সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি আদায় করা যেন এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রেতারা দায়ী করছেন একে অপরকে। ২০২৩ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের এক জরিপে বলা হয়, এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাস কিনতেই ভোক্তাদের মাসে অন্তত ২১৫ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়। সমন্বিতভাবে এই অর্থ লোপাটে নেতৃত্ব দিচ্ছে উৎপাদনকারী মিল, ডিলার এমনকি খুচরা বিক্রেতারা; যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।
সরকারনির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানান এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতা মো. সেলিম খান। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, বিইআরসি যেদিন ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে, সেদিনই পাইকারি পর্যায়ে তা ২ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। বিইআরসি দাম যাই নির্ধারণ করুক না কেন, মিলগেট থেকেই আমাদের বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হয় একেকটি সিলিন্ডার। সব খরচ মিলিয়ে আমাদের পক্ষে বিইআরসি ঘোষিত দরে বিক্রি করা সম্ভব নয়।
এই বক্তব্যে সহমত পোষণ করেন বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির আরেক নেতা তাহের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু তাহের কোরাইশী। ওমেরা এলপি গ্যাসের ওই ডিস্ট্রিবিউটর দাবি করেন, তাদের কোম্পানিও মিলগেটে ২ হাজার ২০০ টাকা দর ঘোষণা করেছে। তাদের কমপক্ষে ৯০ টাকা কমিশন না হলে লোকসান দিতে হবে। এ সময় তিনি বলেন, গত মাসে (এপ্রিলে) ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। অথচ তখন আমাদের কিনতে হয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে। বিইআরসি ঘোষিত দরে কোনো দিনই আমরা কিনতে পারিনি।
বিষয়টি নিয়ে বিব্রত খোদ বিইআরসি। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কোনো সংকট নেই। চলতি মাসে আমদানি ভালো হয়েছে। তাই মাঠ পর্যায়ে দাম পর্যবেক্ষণ করতে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবার শুরু হয়েছে বোতলজাত করা একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া। বাজার পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য আমরা একটা কমিটি করেছি। কমিটি প্রতিদিনই বৈঠকে বসে। আমরা ডিসিদের চিঠি দিচ্ছি। তারা জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটর করছেন, যেন বেশি দামে বিক্রি না হয়। এলপিজি বাজারে আছে এবং আরও আসছে। কিন্তু আমাদের জনবলের কথা মাথায় রাখতে হবে। আমাদের এত বেশি জনবল নেই যে এত বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা জরুরি বলে আমি মনে করি।
দেশে ব্যবহৃত এলপিজির ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। মাত্র দুই শতাংশ সরকারিভাবে বোতলজাত করা হয়। তাই সরকারি এলপিজির দাম বাড়া বা কমায় বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের তথ্য বলছে, একজন ক্রেতাকে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গড়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকারও বেশি বাড়তি গুনতে হচ্ছে। সে হিসাবে ভোক্তারা বাড়তি ৩০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ করছেন। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পকেটে ভরছে এলপি গ্যাস উৎপাদন আর বিপণনের ত্রিমুখী সিন্ডিকেট, যার যথেষ্ট প্রমাণ সরকারের হাতে আছে বলেই দাবি অধিদপ্তরের।
এদিকে বাজার ঘুরে মেলে এর চাইতেও কঠিন সত্যতা। ৫০০ বা ১ হাজার টাকা নয়, রাজধানীর বেশির ভাগ এলপিজি দোকানেই আরও অনেক বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে ভোক্তাদের কাছ থেকে। রাজধানীর মহখালীর ওয়ারল্যাস মোড়ে রফিয়া এন্টারপ্রাইজে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কত জানতে চাইলে বলা হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দাম তো ১ হাজার ৯৪০ টাকা। তাহলে বাড়তি দাম কেন দেব- এমন প্রশ্নের উত্তরে দোকানের স্বত্বাধিকারী মফিজুল ইসলাম বলেন, সরকার তো দাম নির্ধারণ করেই খালাস। কিন্তু আমরা তো জানি আমাদের কী অবস্থা। কোম্পানিকেই দিতে হয় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য ১ হাজার ৯০০ টাকা। দোকানেই উপস্থিত যমুনা এলপি গ্যাসের এক প্রতিনিধিকে দেখিয়ে বলেন, বিশ্বাস না হলে তাকে জিজ্ঞেস করেন। সত্যতা স্বীকার করলেন কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয়দানকারী ইউসুফ হোসেনও। তিনি বলেন, ‘আমরা তো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করি। কোম্পানি থেকে একটি সিলিন্ডার আনতে আমাদের খরচ হয় ১ হাজার ৮০০ টাকার মতো। পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক মজুরিসহ সেই সিলিন্ডার আমরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, যা খুব বেশি নয়। কিন্তু সরকারনির্ধারিত দামের চাইতে কোম্পানিকে বেশি টাকা কেন দিতে হয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, তাতে তো কিছু খরচ লুকায়িতই থেকে যায়। এই যেমন ধরেন আমাদের একেকটি গাড়িকে অন্তত তিনটি মোড়ে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। আমাদের একটি গাড়ি গত মাসে ১৫টি জায়গায় টাকা দিয়েছে এর জন্য। তিন মাসে এই হিসাব ৪৫শ টাকা। এই খরচ তো সরকার হিসাব করে না। আমাদের তো এই অর্থ কোনো না কোনোভাবে তুলতে হবে।
কিন্তু ১ হাজার ৫০০ হোক বা ২ হাজার হোক, সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে কেন বাড়তি দাম নিতে হবেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে মগবাজার রেলগেটের অপর একটি দোকানের মালিক রহমত উল্লাহ বলেন, জিনিসপত্রের দাম কীভাবে বাড়ছে দেখছেন? দোকানের ভাড়া মাসে দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা। কর্মচারীর বেতন-ভাতা সবই তো আমাদের দিতে হয়। এইটুকু লাভ না করলে চলে?
ডিলারদের কাছ থেকেই বাড়তি দাম দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয় দাবি করে রাজধানীর ভুতের গলির এক বিক্রেতা বলেন, ‘আমাদেরই এ ডিলারদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায় কিনতে হয়। এর সঙ্গে প্রত্যেক বোতলের পরিবহন খরচ রয়েছে। সেটি যোগ করলে এলপিজির ক্রয়মূল্য, দোকান ভাড়া, কর্মচারী, আমার নিজের সংসার খরচÑ কুলাব কীভাবে?
এমনিতেই দ্রবমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এমন অবস্থায় এলপিজির বাড়তি দাম যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার সালমা আক্তার বলেন, ‘সবকিছুরই দাম বাড়ছে। কিন্তু স্বামীর তো বেতন বাড়েনি এক টাকাও। যেই টাকা আগে পাইত সেই টাকাই এখনো পায়। তিন বছর আগেও এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। এখন সেটি কিনতে হচ্ছে আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায়। আমি নিজেও ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে রেখে কোনো চাকরি করতে পারি না। মাস শেষে যে কয়েকটা টাকা বাড়তি থাকে, সেটা এখন খরচ হয়ে যাচ্ছে এলপিজির বাড়তি দাম দিতে। এভাবে কত দিন চলবে?
বাড়তি এই বাজারমূল্যে অর্থ সংস্থানের উপায় না পেয়ে পরিবারকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কীভাবে বাঁচব বলেন। যে এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, সেটাই এখন প্রায় তিন গুণ দামে ৩ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। এই অর্থ মেটাতে সংসারের ছোটখাটো অনেক চাহিদা অপূর্ণ রাখতে হচ্ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাব।’
এলপি গ্যাস অপারেটরগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) মনে করছে, শিল্পকারখানাসহ বহুমুখী কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে টান পড়েছে। খুচরা সরবরাহে ঘাটতির ক্ষেত্রে এটিকেই কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বাড়ছে দাম।
এ ব্যাপারে লোয়াব নেতা ও ওমেরা গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজম জে চৌধুরী বলেন, শিল্পকারখানাসহ বহুমুখী কাজে এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিল্প গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে রান্নার গ্রাহকেরা কম গুরুত্ব পাচ্ছেন। চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের ওপর ভর করে দাম ঠিক হবে দাবি করে তিনি বলেন, সরকারি সংস্থা বিইআরসি যেসব প্যারামিটার দিয়ে প্রতি মাসে দাম ঠিক করে, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণে তাদের নির্ধারিত ওই দর কার্যকর হয় না।
তবে বাজার নিয়ন্ত্রণেও বিইআরসি ব্যর্থ বলে দাবি করেন জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম। রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বিইআরসি। জনবলের দোহাই দিয়ে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি দিনে দিনে নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হচ্ছে এ ক্ষেত্রে।

