জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার এবং আন্দোলনের প্রকৃত কৃতিত্ব কারÑ এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অতীতের ইতিহাসের ব্যাখ্যা নয়; বরং তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন, রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কৌশলও বটে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের অধিকাংশই একক কোনো ব্যক্তি বা দলকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, যে রাজনৈতিক শক্তি জুলাই অভ্যুত্থানকে নিজেদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তারা তরুণ ভোটারদের কাছে নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক বৈধতার ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দল নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ানের অংশ করেছে; তেমনি ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ও ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বিতর্ক : অভ্যুত্থানের পর থেকেই সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নÑ এই আন্দোলনের প্রকৃত ‘মাস্টারমাইন্ড’ কে? বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারকে বিতাড়িত করেছে কোনো সমন্বয়ক নয়, জুলাই বিপ্লব আন্দোলনের একমাত্র মাস্টারমাইন্ড হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তবে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অবস্থান ভিন্ন। বেসরকারি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি নিজেকে কখনোই জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মনে করি না। জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব কারো একার নয়। কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিসহ সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের এতে অবদান আছে। সব দলের কর্মীরাই আত্মত্যাগ করেছেন। জুলাই আন্দোলনের ফলাফল জুলাইয়ে পাওয়া গেলেও এর প্রেক্ষাপট অনেক আগের। আমি মনে করি, জুলাই-আগস্টে এসে দেশের সর্বস্তরের জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়েছিল।’
অবশ্য বিএনপির দাবি, আন্দোলনে তাদের চার শতাধিক নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন এবং দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতাই জুলাই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
জামায়াতের অবস্থান : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতেও যখন কাউকে এককভাবে আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে, তখন তিনি তার প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন একজনকে এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তখনো এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম।’
এদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড বা দাবিদার নেই। প্রকৃত কৃতিত্ব মুক্তিকামী মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের।’ তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকার এবং বিএনপি তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।” মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্যে, ‘সহস্রাধিক প্রাণ আর হাজারো মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সরকার গঠন করার পর সেই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’
এনসিপি যা বলছে : জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনে করে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’। দলটির মতে, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট এসেছে এই অভ্যুত্থান থেকেই।
দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন পূরণে আগে কাজ করতে হবে। গণভোটের রায়ের আলোকে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। অনেক বাবা তার সন্তান হারিয়েছেন। এই মজলুম দলের মধ্যে বিএনপিও ছিল, জামায়াতে ইসলামীও ছিল। সবার একটাই উদ্দেশ্য ছিলÑ বাংলাদেশে আমরা ফ্যাসিবাদীব্যবস্থার পতন ঘটাব।’ তিনি বলেন, ‘জনগণ নির্বাচনে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষেও রায় দিয়েছে।’
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের ফাঁকে ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ লিডারস স্টেজ’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরেন। সে সময় তিনি জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহফুজ আলমকে সামনে এনে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পেছনের কারিগর মাহফুজ। যদিও মাহফুজ সব সময় বলেন, তিনি একা নন; আরো অনেকে আছেন।’ পরবর্তীকালে মাহফুজ আলমও স্পষ্ট করেন, তিনি এককভাবে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ নন; এটি ছিল গণমানুষের সম্মিলিত আন্দোলন।
স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক কৌশল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো এখন আদর্শিক অবস্থান ও আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন ও তরুণ ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে প্রচার বাড়ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলের নিবেদিতপ্রাণ ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অনেক যোগ্য প্রার্থীকে ইতিমধ্যে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় গণআন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানÑ প্রতিটি অধ্যায়ই বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব বয়ানে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। রাজনীতি বিশ্লেষকরদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থান নিয়েও এখন সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কেউ এটিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতি হিসেবে তুলে ধরছে, কেউ ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ বলছে, আবার কেউ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে ‘জুলাই’ শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়; এটি হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক বৈধতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং তরুণ ভোটারদের সমর্থন অর্জনের অন্যতম প্রতীক। ফলে আন্দোলনের প্রকৃত উত্তরাধিকার নিয়ে এই নীরব প্রতিযোগিতা আগামী দিনেও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
নির্বাচনের বিষয়ে উল্লেখ করে রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে শিক্ষক, ছাত্র, ইমাম, গণমাধ্যমসহ কমবেশি সবাই সরকারের তোষামোদ করত। এর মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ প্রশ্ন করত শাসককে। সমালোচনা করত সরকারের কাজের। এ কারণেই দেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। বিগত তিনটি নির্বাচনে নাগরিকদের মূল্যায়ন ছিল না। এটি আমাদের ব্যর্থতা ছিল। এর ফলেই ২০২৪-এ গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা একটি জবাবদিহিমূলক সরকার চাই। সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, যাতে আর কোনো সরকার মানুষের ভোট হরণ করতে না পারে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন