সিলেটে হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় শিশুমৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারানো শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের বয়স ৫ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে। এদের বেশির ভাগেরই প্রচণ্ড জ্বরের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত তীব্র জটিলতা ছিল।
সিলেটের প্রধান দুটি হাসপাতালে বর্তমানে ২৪১ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাব পরীক্ষায় এ পর্যন্ত ১৪২ জনের শরীরে আনুষ্ঠানিকভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে অনেক শিশুর রক্তের নমুনার রিপোর্ট আসতে দেরি হওয়ায় ক্লিনিক্যাল লক্ষণের ভিত্তিতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মারা যাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ আগে থেকে পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল অথবা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) থেকে বাদ পড়েছিল।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুদের শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠার পাশাপাশি তীব্র জ্বর, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসিয়ে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যোগাযোগ করার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে টিকাদান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সিলেটে এক দিনে আরও ৩ শিশুর মৃত্যুর যে তথ্য জানানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন ও শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় এই তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মারা যাওয়া শিশুরা হলোÑ সিলেট মহানগরীর আখালিয়া সুরমা আবাসিক এলাকার আবদুল মুমিনের ছেলে মাহাদি হাসান (৫ মাস), দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সুন্নাহ মিয়ার ছেলে মুসতাকিন (৬ মাস) ও সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর থানার সুরেশনগরের জাকারিয়ার মেয়ে জারা (৭ মাস)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ জন। সিলেটে ল্যাব টেস্টের সুযোগ না থাকায় উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোনো রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তার নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষা করে রিপোর্ট আনা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গেল ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে আরও ৫৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৯ জন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন ও মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৮ জন ভর্তি হয়েছে।
এ ছাড়া রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন এবং একজন করে ভর্তি হয়েছেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
আর শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ২৪১ জন ভর্তি ছিলেন, তার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৪ জন আছেন শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৫৮ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১৫ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ জন, রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ জন, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন, বাহুবল শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন, আজমিরিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন, জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন ও জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
২ জন করে ভর্তি আছে আল হারামাইন হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ১ জন করে ভর্তি আছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান সিলেটের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মূলত দুর্গম এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনতে তারা এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি সময়মতো টিকা দেওয়া থাকে। আর লক্ষণ দেখা দিলে ওঝা বা কবিরাজের কাছে না গিয়ে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তারা বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন