মাত্র ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পকে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যয়বহুল ও পরিবেশ বিধ্বংসী বিদ্যুৎ প্রকল্প আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোটের (বিডব্লিউজিইডি) সঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
গতকাল শনিবার রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। ২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সিএমইসির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির সাড়ে চার বছর পরও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
প্রকল্পের জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ২০ একরের পাশাপাশি স্থানীয়দের ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ মালিক জমি দিতে রাজি না হলেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে জমি দখল করে সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়। আদালতে মামলা চলাকালেই জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় অনেক ভূমি মালিক জমি হারিয়েও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুনর্বাসনের তালিকায় রাখা হয়েছে মাত্র ৪০ জনকে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতায় (পিএলএফ) চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে সরকার প্রতি ইউনিট ২১ দশমিক ৭৮ সেন্ট দরে (২৬ দশমিক ৭৯ টাকা) বিদ্যুৎ কিনবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৪৭ টাকা। কোনো কারণে পিএলএফ ২০ শতাংশে নেমে এলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিতে হবে কমপক্ষে ৭৫ টাকা। এর ফলে বছরে নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সরকারের ঘাড়ের ওপর পড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। অর্থাৎ, প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘এ পরিমাণ টাকা দিয়ে ৪২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যেত, যেখান থেকে কোনো জ¦ালানি ছাড়াই বছরে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারত।’
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা) ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন (১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করছে। বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা কখনোই উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করবে। যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না হয়, তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬ হাজার ১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য তৈরি হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি করপোরেশনে আরো বেশি বর্জ্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ফলে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের বদলে ঢাকাবাসীকে নোংরা জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে এই প্রকল্প।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯ দশমিক ৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারী ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১ দশমিক ১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যানসার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বাড়াবে। দিল্লির বর্জ্যবিদ্যুৎ কেন্দ্র বায়ুদূষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পের ফলে ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ কমবে। কিন্তু, অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন। বর্জ্য পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ কেজি কার্বন নির্গমন হয়, যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিন গুণ। পূর্ণমাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী হবে ঢাকার নগরবাসী এবং বাংলাদেশের মোট কার্বন নির্গমন বাড়িয়ে দেবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন