× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ১০:৪০ পিএম

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে নীরব বিপ্লব

ফারুক আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ১০:৪০ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলে কৃষির আধুনিকায়ন ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে। সরকারের পরিবেশবান্ধব কৃষি নীতি এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার হাত ধরে বরিশাল বিভাগের চার জেলায় দৃশ্যমান সাফল্যের শেষপ্রান্তে পৌঁছেছে একটি মেগা প্রকল্প। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরাসরি বাস্তবায়নে চলমান ‘বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’ এরই মধ্যে ভৌত অগ্রগতির দিক থেকে প্রায় ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে ৩৪৮ কোটি ৯১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের শেষ মুহূর্তের কাজ এখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। মূল লক্ষ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই মহতী উদ্যোগের সফল সমাপ্তি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষিণাঞ্চলের চারটি প্রধান জেলার ২৮টি উপজেলার বিস্তীর্ণ অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় এনে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করা। এর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হলো পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার মোট সেচযোগ্য জমির সেচকৃত অংশ ৩৫.৭৮ থেকে ৩৯.৫২ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার এক লাখ ৫৭ হাজার ২৯২ হেক্টর থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৬ হেক্টরে নিয়ে যাবে। এই আধুনিক ও টেকসই সেচব্যবস্থা প্রয়োগের ফলে পানির অপচয় যেমন কমবে, তেমনি অতিরিক্ত ১৬ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি নতুন করে সেচের আওতায় আসবে। এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের খাদ্য উৎপাদনে, যা প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ১৪ টন ফসল উৎপাদনে অনন্য ভূমিকা রাখবে।

২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পের প্রধান খাতগুলোর মাঠপর্যায়ের কাজ এখন সফলতার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। চারটি জেলার প্রতিটি অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

খাল পুনঃখনন

প্রকল্প এলাকায় পানি নিষ্কাশন ও ধরে রাখার ধারণক্ষমতা বাড়াতে মোট ৩৭৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৫৩ কিলোমিটারের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জেলাভিত্তিক অর্জনের মধ্যে বরিশালে ১২৫ কিমি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১১৫ কিমি, ঝালকাঠিতে ৭০ কিমির বিপরীতে ৬৮ কিমি, ভোলায় ৭৫ কিমির বিপরীতে ৭৪.৫ কিমি এবং পিরোজপুর জেলায় ১০৫ কিমি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৯৫.৫ কিমি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।

ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ

সেচের পানির অপচয় রোধে ২৫০টি ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণের লক্ষ্য ছিল, যার মধ্যে ২৪৮টি নালা এরই মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরিশাল জেলায় ১২৬টি (লক্ষ্যমাত্রা ১২৮), ঝালকাঠিতে ১৮টি (লক্ষ্যমাত্রা ১৮), ভোলায় ৭১টি (লক্ষ্যমাত্রা ৭১) এবং পিরোজপুর জেলায় ৩৩টি (লক্ষ্যমাত্রা ৩৩) সেচনালা শতভাগ প্রস্তুত করা হয়েছে।

বক্স কালভার্ট ও ফসল রক্ষা বাঁধ

কৃষকদের যাতায়াত ও পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৫০টি বক্স কালভার্টের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২৫টি (বরিশাল ৫৩, ঝালকাঠি ৩০, ভোলা ১৪ ও পিরোজপুর ২৮) নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যা ও জোয়ারের পানি থেকে ফসল বাঁচাতে ৪০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের মধ্যে ২৬ কিলোমিটার (বরিশাল ৬ কিমি, ঝালকাঠি ৫ কিমি ও পিরোজপুর ১৫ কিমি) কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ও ড্রিপ সেচ

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে ২০টি সোলার সেচব্যবস্থার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৮টি (বরিশাল ৮, ঝালকাঠি ৫, ভোলা ১ ও পিরোজপুর ৪) সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক সোলার ড্রিপ ব্যবস্থার ৭৫টির মধ্যে ৬১টি (বরিশাল ১০, ঝালকাঠি ১০ ও পিরোজপুর ৪১) এরই মধ্যে সচল হয়েছে।

প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের সুফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ। তিনি জানান, এ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া ৩৫৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের ফলে সরাসরি প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির সেচ ও নিষ্কাশন সুবিধা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি স্কিমে ১২০০ মিটার করে ভূ-গর্ভস্থ সেচনালাসহ বিদ্যুতায়িত সেচযন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিকে সরাসরি আধুনিক সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি সৌরশক্তিচালিত সেচযন্ত্র স্থাপনের ফলে সেচকাজে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি কৃষকদের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হচ্ছে।

কৃষিকে টেকসই করতে এই প্রকল্পের অধীনে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুনঃখননকৃত খাল, পুকুর ও ফসল রক্ষা বাঁধের পাড়ে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে মানবসম্পদ উন্নয়নে। স্থানীয় কৃষক-কিষানিদের আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন সেচযন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণ জনপদে বিপুলসংখ্যক মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখছে।

চলমান এই প্রকল্পের নানামুখী ইতিবাচক প্রভাবের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে এর পরিধি বাড়ানোর দাবি এখন বেশ জোরালো। প্রকল্পের অধীনে যে লক্ষ্যমাত্রা অনুমোদিত ডিপিপিতে (উচচ) নির্ধারিত আছে, তা প্রকল্প এলাকার সামগ্রিক ও বাস্তব চাহিদার তুলনায় কিছুটা অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান সরকারের দূরদর্শী কৃষি নীতি, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, বৃক্ষরোপণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের যে মহাপরিকল্পনা, তার সঙ্গে এই প্রকল্পের প্রতিটি উদ্দেশ্য শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষির এই অভাবনীয় ও ইতিবাচক জোয়ারকে ধরে রাখতে এবং দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদনকে আরও বেগবান করতে চলমান প্রকল্পের পরিধি বৃদ্ধি করা জরুরি। অথবা অনতিবিলম্বে এই চার জেলা ও আশেপাশের অঞ্চলে সমধর্মী নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নের এই ধারাকে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যা আগামী দিনে বাংলাদেশের টেকসই কৃষি বিপ্লবের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

Link copied!