সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায়। এক বছরে জমা হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে এই অর্থের উৎস, প্রকৃতি ও বৈধতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
শুক্রবার রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসে তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলোতে। গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা ছিল ২০২৫ সালে।
তবে বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সুইস ব্যাংকে থাকা সব অর্থ যে অবৈধ বা পাচার করা সম্পদ, এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মোট আমানতের প্রায় ৯৯ শতাংশই বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর নামে জমা রাখা তহবিল। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশে তহবিল সংরক্ষণ ও বিনিয়োগ করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফলে সুইস ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি মানেই সব অর্থ পাচার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশীয় গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যদি বিদেশে বাংলাদেশি অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। বৈধ ব্যাংকিং তহবিল, প্রবাসীদের সঞ্চয় এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সঙ্গে অবৈধ অর্থের মিশ্রণ ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষভাবে প্রয়োজন বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বিত উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। সুইজারল্যান্ডও আর আগের মতো সম্পূর্ণ গোপনীয়তার আড়ালে নেই। ফলে সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা এখন তুলনামূলক সহজ।
অর্থ পাচার শুধু রাজস্ব ক্ষতিই করে না, এটি দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে অর্থ দেশের শিল্প, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা, তা বিদেশে চলে গেলে জাতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়। তাই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানতের এই উল্লম্ফনকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারের উচিত একদিকে বৈধ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা, অন্যদিকে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা। অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার জরুরি। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বৃদ্ধির এ তথ্য তাই শুধু আলোচনার বিষয় নয়, এটি আর্থিক সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির তথ্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে থাকা সব অর্থ অবৈধ নয়, তবে অর্থের উৎস ও বৈধতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অর্থ পাচার রোধ, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থে এ ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

