দফায় দফায় পানির দাম বৃদ্ধি করেছে রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা)। ২০২২ সালে এক লাফে পানির দাম তিনগুণ বাড়িয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের শেষের দিকে ৩০ শতাংশ দাম বাড়ানোর জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিল রাজশাহী ওয়াসা। তাতে এখনো সাড়া পাননি। পানির দাম বৃদ্ধি ও ওয়াসার গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও লোকসান হচ্ছে। তবে কি কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে তা দেখার কেউ নেই। আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য ও স্বচ্ছতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে।
বিগত তিন অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে (অডিট রিপোর্ট) দেখা যায়, পানি বিক্রি এবং টেন্ডার থেকে রাজশাহী ওয়াসার রাজস্ব ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ কোটি ১৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকায় পৌঁছায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব কমে ১৩ কোটি ৬২ লাখে দাঁড়িয়েছে। যদিও মহানগরীজুড়ে প্রতিবছর ওয়াসার গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ২০২২-২৩ সালে ৪৮ হাজার ৬৪৫, ২০২৩-২৪ সালে ৪৯ হাজার ৯৫৮ এবং ২০২৪-২৫ সালে ৫১ হাজার ৬৪২। ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে ১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় দেখানো হয়েছে, যা একই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার তিনগুণেরও বেশি। মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যেখানে ব্যয় ৩০ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে একটি বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে, রাজস্ব আদায় রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। মোট আয় ২৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ সালে রাজস্ব বেড়ে ২০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং মোট আয় ২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু ব্যয় বেড়ে ৩৭ লাখ ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আর্থিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোক্তা সংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কাঠামোগত অদক্ষতা এবং দুর্বল আর্থিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ইঙ্গিত করছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ওয়াসার এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন গ্রাহক এবং রাজস্ব উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন লোকসান অনিয়ন্ত্রিত পরিচালন ব্যয়, ত্রুটিপূর্ণ ক্রয় বা পদ্ধতিগত ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।’
রাজশাহী ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, বছরে চারবার তিন মাসের ব্যবধানে পানির বিল প্রদান করেন গ্রাহকরা। কিস্তির বিল দেরিতে পাওয়ায় গত অর্থবছরের হিসাবের সঙ্গে এই পরিমাণ যোগ করা যাবে না। এর পরিবর্তে পরবর্তী অর্থবছরের রাজস্বে যোগ করা হবে।
বার্ষিক প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি সম্পর্কে প্রধান বাজেট কর্মকর্তা আবদুর রহমান দাবি করেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখানো রাজস্ব ছিল তাদের লক্ষ্য। যেখানে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানো রাজস্ব ছিল প্রকৃত আদায়।
ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) তৌহিদুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালে আমরা পানির দাম বাড়িয়েছিলাম। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ করে পানির দাম সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি।
তিনি বলেন, সংস্থার বড় প্রকল্পগুলো বর্তমানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একবার এই বৃহৎ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয়ে গেলে, আমরা অবশ্যই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে আরও কর্মসূচি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।’
ওয়াসার এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কিছু বকেয়া বিলও রয়েছে। আমরা সেই বকেয়া টাকা আদায়ের চেষ্টা করছি এবং কার্যক্রম দ্রুততর করছি।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, উচ্চমূল্য বা স্থায়ী ক্ষতির বোঝা বাসিন্দাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে এবং মানুষ তাদের বিল পরিশোধও করছে। তবুও তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বচ্ছতা ছাড়া এই বোঝা জনসাধারণের ওপর পড়বে।

