সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ধোপাছড়ী, সাঙ্গু বিট এখন বনখেকোদের কবলে। একদিকে প্রজনন মৌসুমের সরকারি নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চরম দুর্নীতি- সব মিলিয়ে ধ্বংসের মুখে পড়েছে ধোপাছড়ি এই অভয়ারণ্য। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, দোহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন, ধোপাছড়ী বিট কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাব্বি এবং সাঙ্গু বিট কর্মকর্তা সুজিত চাকমার প্রত্যক্ষ যোগসাজশেই অভয়ারণ্যজুড়ে চলছে বাঁশ নিধনের মহোৎসব।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট- এই তিন মাস বাঁশ কাটা, পরিবহন ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ ধোপাছড়ী অভয়ারণ্যে এই নিয়ম যেন কেবলই কাগুজে আদেশ। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে চলছে বাঁশ কাটা ও পাচার। সিন্ডিকেটের এক বাঁশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ সময়েও আমরা বাঁশ ব্যবসা করছি শুধু বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে।
রক্ষকই যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন আইনের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন পড়ে না। এই ব্যবসায়ী আরও জানান, প্রতিটি বাঁশ নদীপথে পরিবহনের জন্য বন বিভাগকে নির্ধারিত অংকের চাঁদা দিতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বাঁশ পাচারের বিপরীতে দোহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তাকে ৩ টাকা এবং ধোপাছড়ী ও সাঙ্গু বিট অফিসকে ৫ টাকা করে দিতে হয়। এই আর্থিক লেনদেনের বিনিময়েই বন কর্মকর্তাদের আশির্বাদপুষ্ট হয়ে রুবেল সিন্ডিকেট, কামাল সিন্ডিকেট এবং বান্দরবানের মোস্তাক সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে তাদের অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ধোপাছড়ী অভয়ারণ্যে ও সাঙ্গু বিট এলাকার ভেতর থেকে ছড়া দিয়ে বাঁশগুলো শঙ্খনদীর মুখে নিয়ে আসা হয়।
এরপর সাঙ্গু বিট অফিসের আওতাধীন চেয়ারম্যানঘাটা ও সেমিরমুখ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল সব অবৈধ ডিপো। প্রতি বৃহস্পতিবার শঙ্খ নদী দিয়ে শুরু হয় বাঁশের চালি রওনা হওয়ার তোড়জোড়, যা শনিবার ভোররাতে দোহাজারী রেলওয়ে শঙ্খনদী ব্রিজের নিচে পৌঁছায়। সেখান থেকে পাইকারদের মাধ্যমে বাঁশ চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিট অফিসের মাত্র ৫০০ ফুট দূর দিয়ে হাজার হাজার বাঁশ পাচার হলেও কর্মকর্তারা অদ্ভুত নীরবতা পালন করেন।
এ বিষয়ে দোহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন, ধোপাছড়ী বিট কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাব্বি ও সাঙ্গু বিট কর্মকর্তা সুজিত চাকমার সাথে যোগাযোগ করা হলে, তারা অভিযোগের সদুত্তর না দিয়ে বরং প্রতিবেদককে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
কোনো আইনানুগ পদক্ষেপ না নিয়ে ফোন কেটে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, অসাধু কর্মকর্তারা নিজেরা এই বাণিজ্যের সাথে কতটা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ধোপাছড়ী ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য, আর বন কর্মকর্তারা সেখানে বাঁশ ও গাছ চুরির সিন্ডিকেট তৈরি করে নিজেদের পকেট ভারি করছেন। রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষক হয়ে ওঠেন, তখন বন রক্ষা করা অসম্ভব।
অবিলম্বে চেয়ারম্যানঘাটা ও সেমিরমুখের অবৈধ ডিপোগুলো উচ্ছেদ, সিন্ডিকেটের হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং দোহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট অসাধু বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পরিবেশ সচেতন সমাজ। এ ছাড়াও দোহাজারী রেঞ্জের আওতাধীন বরগুনী, সাঙ্গু, ধোপাছড়ির বিটের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. নাবিদ ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন