ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

আধা কিলোমিটারের নদী এখন চল্লিশ হাত, কার দখলে বলেশ্বর?

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২৬, ১১:১৪ এএম
বলেশ্বর নদী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বলেশ্বর নদী দখল ও ভরাটের কবলে পড়ে নাব্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বাগেরহাট জেলা ও পিরোজপুর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় প্রায় অর্ধকিলোমিটার চওড়া খরস্রোতা এই নদী এখন কোথাও কোথাও সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র চল্লিশ হাত।

বাগেরহাট জেলার সীমান্তবর্তী অংশে দীর্ঘদিন ধরে কোনো খনন কার্যক্রম না হওয়ায় নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত খালে পরিণত হয়েছে। চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের অশোকনগর, দক্ষিণ চরবানিয়ারী, বাওয়ালী কান্দি গ্রাম এবং নাজিরপুর উপজেলার বানোয়ারী এলাকার দুই পাড়ে জেগে ওঠা চর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কৃষিজমি, মৎস্যঘের ও বসতবাড়ি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্র নিয়মিত চর দখল করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নামতে না পেরে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা এবং বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি।

শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে জেগে ওঠা বালুচর দখলদারদের নতুন ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। নদীপথে একসময় লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল করলেও এখন তা প্রায় বন্ধ। শ্যাওলা ও কচুরিপানায় ভরে গেছে নদীর বুক।

স্থানীয় বাসিন্দা মুজিবর মোল্লা বলেন, এই নদীটা প্রায় অর্ধকিলোমিটার চওড়া ছিল, যা এখন চল্লিশ হাতে নেমে এসেছে। আমার জন্মের পর থেকে কখনো খনন হতে দেখিনি। আমরা চাই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে দ্রুত নদী খনন করা হোক। খনন হলে কৃষকরা সেচ সুবিধা পাবে এবং কৃষিতে বড় উপকার হবে।

জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, একসময় এই বলেশ্বর নদী ছিল আমাদের এলাকার প্রাণ। সারাবছর পানি থাকত, নৌকা-ট্রলার চলত অবাধে। এখন দখল ও ভরাটের কারণে নদী সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও মাত্র চল্লিশ হাতে নেমে এসেছে। নাব্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রুত খনন না হলে নদী মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, নদীর চরে যে দখল চলছে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে অনেকে দাবি করেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রভাবশালী মহলের অনুসারীরাই এসব চরে দখল বসিয়েছে। নতুন করে কোথাও চর জেগে উঠলেই তারা আগে গিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে নেয়।

প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, একসময় এই নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। নদী ছিল প্রশস্ত ও স্রোতস্বিনী। বর্তমানে অবৈধ দখল ও নাব্য সংকটের কারণে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। কৃষিজমিতে সেচের পানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বলেশ্বর নদী খননের জন্য বর্তমানে কোনো অনুমোদিত প্রকল্প নেই। তবে নদী দখলের অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে খনন ও দখল উচ্ছেদের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত দখল উচ্ছেদ ও নিয়মিত খনন কার্যক্রম শুরু না হলে একসময় দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই নদী মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।