ভোট মানেই আলাদা এক উত্তেজনা। রাজপথে পোস্টার, টেলিভিশনের পর্দায় তর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিনিময়- সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এক বিশেষ আবহাওয়া। আগামীকাল ঠিক এমনই এক মুহূর্তের মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বের তিন ভিন্ন মহাদেশের তিনটি দেশ।
এশিয়ার শক্তিধর অর্থনীতি জাপান, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনে থাকা থাইল্যান্ড, আর ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী গণতন্ত্র পর্তুগাল- এই তিন দেশের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ।
তিন দেশের বাস্তবতা ভিন্ন, সংকট ভিন্ন, প্রত্যাশাও ভিন্ন- তবু সিদ্ধান্তের জায়গা একটাই: ব্যালটের রায়।
চলুন দেখে নেওয়া যাক তিন দেশের নির্বাচনী আবহাওয়া ও প্রেক্ষাপট।
পর্তুগাল
আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট। এই দফায় মুখোমুখি হচ্ছেন মধ্যপন্থি সমাজতান্ত্রিক প্রার্থী আন্তোনিও জোসে সেগুরো এবং অতি-ডানপন্থি নেতা আন্দ্রে ভেনচুরা।
গত বছর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ভেনচুরার নেতৃত্বাধীন দল চেগা প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের পর থেকে এটি পর্তুগালের পঞ্চম জাতীয় ভোট। প্রথম দফায় ১১ জন প্রার্থীর কেউই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় গড়িয়েছে নির্বাচন। চার দশকের মধ্যে এমন বিভক্ত ভোটচিত্র পর্তুগালের রাজনীতিতে গভীর মেরুকরণকেই সামনে এনেছে।
এই ভোটের ফল নির্ধারণ করবে- পর্তুগাল কি মধ্যপন্থি ধারাতেই থাকবে, নাকি ইউরোপজুড়ে উত্থানশীল কট্টর ডানপন্থার ঢেউ এখানেও আরও শক্ত হবে।
থাইল্যান্ড
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। প্রায় তিন বছর আগে হওয়া শেষ নির্বাচনের পর থেকেই দেশটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
সে সময় বিজয়ী দল ভেঙে দেওয়া হয়, এবং পরপর দুই প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করা হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই নতুন নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়, যখন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হন। এর মধ্যেই কম্বোডিয়া সীমান্তে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
আসন্ন নির্বাচনে অনুতিনের রক্ষণশীল ভুমজাইথাই পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে প্রতিষ্ঠাবিরোধী পিপলস পার্টি এবং সাবেক শাসক দল ফিউ থাই-এর বিরুদ্ধে।
এই নির্বাচন থাইল্যান্ডের জন্য শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; বরং সেনাবাহিনী, আদালত ও রাজনীতির দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব থেকে দেশটি বেরিয়ে আসতে পারবে কি না- তারও বড় পরীক্ষা।
জাপান
জাপানে আগামীকাল রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নিম্নকক্ষের নির্বাচন। তবে নির্বাচনের আগে ভারী তুষারপাতের পূর্বাভাসের কারণে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং তাদের জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি সংসদের নিম্নকক্ষে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের জরিপ বলছে, জোটটি বড় ধরনের বিজয়ের দিকেই এগোচ্ছে।
গত অক্টোবরে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তাকাইচি টোকিওতে ১২ দিনের প্রচারণার শেষ ভাষণে বলেন, ‘দশকের পর দশক অতিরিক্ত আর্থিক কৃচ্ছ্রতা এবং ভবিষ্যতের জন্য অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ জাপানকে দুর্বল করে দিয়েছে।’
তিনি প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে বড় আকারের কর প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। দুর্বল ইয়েনকে রপ্তানি শিল্পের জন্য ‘বড় সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করায় বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে, এতে আমদানি মূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
প্রধান বিরোধী মধ্যপন্থি সংস্কার জোটের সহ-নেতা ইয়োশিহিকো নোদা বলেন, ‘অতিরিক্ত দুর্বল ইয়েন সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়। প্রধানমন্ত্রী জনগণের অনুভূতি বুঝতে পারছেন না।’
তাকাইচির প্রধানমন্ত্রীত্বের অধীনে এটি প্রথম নিম্নকক্ষ নির্বাচন, যা তার নেতৃত্বের ওপর সরাসরি জনরায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

