× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫, ০৯:৪৮ পিএম

বিশ্বশান্তির শহীদের কফিন : কেবল শোক নয়, জাতীয় অহংকার

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫, ০৯:৪৮ পিএম

নিহত ৬ সেনা। ছবি- সংগৃহীত

নিহত ৬ সেনা। ছবি- সংগৃহীত

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ইতিহাসে বাংলাদেশ আজ এক অবিস্মরণীয় নাম। সেই নামের সুনাম ধরে রাখতে বুকের তাজা রক্ত দিচ্ছে বারবার। ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, শনিবার বিকেলের সেই বিষাদময় মুহূর্তটি আবারও প্রমাণ করল যে বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করে না। ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরা আমাদের শহীদদের কফিনগুলো কেবল শোকের প্রতীক নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় অহংকার।

বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েন ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা যে বীরত্ব দেখাচ্ছেন, তা আজ বিশ্বের কাছে এক অনুকরণীয় আদর্শ। শহীদদের রক্তে ভেজা এই গৌরবগাঁথা কেবল সেনাবাহিনীর নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের এক অবিনশ্বর সম্পদ। বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশ যে চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত, এই আত্মত্যাগই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনা, পুনর্গঠন এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আজ এক অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রতিকূল জলবায়ু উপেক্ষা করে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা যে বীরত্ব দেখাচ্ছেন, তা আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তির শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছে।

তবে এই মর্যাদা অর্জনের পথটি মোটেও মসৃণ নয়; এটি এক চরম আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে কেনা গৌরব। ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ একটি অশ্রুসিক্ত দিন হিসেবে আমাদের ইতিহাসে যুক্ত হলো, কারণ আজ সুদানের তপ্ত মরুভূমিতে শাহাদাতবরণকারী আমাদের ৬ জন বীর সন্তানের নিথর দেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফিরে আসছে প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে।

১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, শনিবার বিকেলের সেই বিষাদময় মুহূর্তটি আবারও প্রমাণ করল যে, বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উৎসর্গ করতে দ্বিধাবোধ করে না। সুদানের অ্যাবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের (UNISFA) আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে এক কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলা চালায় একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী।

আকস্মিক এই হামলায় দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেন বাংলাদেশের ছয় জন অকুতোভয় শান্তিরক্ষী। তারা হলেন, কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মন্ডল (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।

এই নৃশংস হামলায় আরও আট জন শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন বীর সদস্য রয়েছেন। ২০ ডিসেম্বর তাঁদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও জানাজা শেষে তাঁদের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নিজ নিজ গ্রামে সমাহিত করা হবে। শহীদদের এই রক্ত আমাদের জাতীয় পতাকার লাল বৃত্তকে যেন আরও উজ্জ্বল ও মহিমান্বিত করে তুলেছে।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও এই গৌরবের মঞ্চে বাংলাদেশের অভিষেক ঘটে ১৯৮৮ সালে। ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে মাত্র ১৫ জন সদস্য পাঠানোর মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা এক বিশাল মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে শীর্ষস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে বিশ্বের ১০টি দেশে 'নীল হেলমেট' মাথায় দিয়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা শান্তির পতাকা বহন করছেন। এটি কেবল সামরিক পেশাদারিত্ব নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অদম্য অঙ্গীকারের এক অনন্য দলিল।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল দায়িত্ব পালন করেনি, বরং বহুবার খাদের কিনারা থেকে মানবতাকে রক্ষা করেছে। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় যখন গণহত্যার ভয়াবহতায় অনেক দেশ তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অসীম সাহসে সেখানে অবস্থান করে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার বিহাচ শহরে ইউরোপীয় সেনারা যখন ব্যর্থ হয়েছিল, তখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হালকা অস্ত্র নিয়ে অকুতোভয় বীরত্বে গণহত্যা রুখে দিয়ে ছিল। সোমালিয়ায় বাংলাদেশি সেনাদের পেশাদারিত্বে মুগ্ধ হয়ে মার্কিন সেনারাও তাদের সাথে কাজ করার বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা কেবল অস্ত্রধারী সৈন্য নন, তাঁরা প্রকৃত অর্থেই মানবতার সৈনিক। কঙ্গো, সুদান, মালি ও দক্ষিণ সুদানে তাঁরা স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং কৃষি উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের মানবিক আচরণের কারণেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন 'বাংলা' ভাষাকে তাদের অন্যতম শ্রদ্ধার ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে আমাদের ভাষার এক অনন্য বিজয়।

মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম ২০১০ সালে শান্তিরক্ষা মিশনে নারী পুলিশের দল পাঠিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এ পর্যন্ত ১,৭১৮ জন নারী শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে অংশ নিয়েছেন। জাতিসংঘ যেখানে নারী শান্তিরক্ষীর হার ২২ শতাংশ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৮-১৯ শতাংশ নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানে আমাদের নারী পুলিশ ও সেনা সদস্যরা অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন, যা বৈশ্বিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

শান্তির এই পথ অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ও রক্তে ভেজা। এ পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ১৭১ জন (সর্বশেষ ৬ জনসহ) বীর শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৩৭ জন, নৌবাহিনীর ৪ জন, বিমানবাহিনীর ৬ জন এবং পুলিশের ২৪ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ২৭২ জন। এই বিপুল আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

শান্তিরক্ষী মিশন কেবল আমাদের সামরিক মর্যাদা বাড়ায়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখছে। এই খাত থেকে বার্ষিক আয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় শক্তি জোগায়। জাতিসংঘ বাংলাদেশের এই ভূমিকাকে 'শান্তির কূটনীতির মোরসাল' হিসেবে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান-এর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক কূটনীতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রথম বারের মতো ডিআর কঙ্গোতে সেনাবাহিনীর তিনটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা আমাদের সক্ষমতার নতুন স্মারক।

২০ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরা আমাদের শহীদদের কফিনগুলো কেবল শোকের প্রতীক নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় অহংকার। বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েন ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা যে বীরত্ব দেখাচ্ছেন, তা আজ বিশ্বের কাছে এক অনুকরণীয় আদর্শ। শহীদদের রক্তে ভেজা এই গৌরবগাঁথা কেবল সেনাবাহিনীর নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের এক অবিনশ্বর সম্পদ। বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশ যে চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত, এই আত্মত্যাগই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

লেখক: সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!