‘আমার সৌভাগ্য যে আমি আজ জীবিত আছি, আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। না হলে আমারও ছবি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমার সহকর্মীদের অনেকের ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। তাদের খোঁজ মিলছে না। কেন যে আয়নাঘর নামটা দেওয়া হলো? কিন্তু আয়নাঘরে তো আয়না ছিল না, ছিল যমদূত, ছিল মৃত্যুর পরোয়ানা। সেই আয়নাঘরে আমরা ছিলাম।’—জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) বিকালে বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত আলোচনা সভায় এ কথা বলেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চলেছে। সেই ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে আমাদের সন্তানদের রক্ত দিতে হয়েছে। যারা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিকে করদরাজ্যে পরিণত করতে আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তাদের এখনো অনুশোচনা নেই। তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার তো দূরের কথা, উল্টো অভ্যুত্থানকারীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছে।’
নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যে ফাটল ধরানোর একটা চেষ্টা কোনো একটা পক্ষ করছে। কিন্তু আমরা তর্ক-বিতর্ক করছি, সংস্কারের বিপক্ষে আলোচনা করছি, নির্বাচন নিয়ে দুয়েকটা পক্ষ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। আমি আহ্বান জানাব, ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য দেশের মানুষ ১৬ বছর সংগ্রাম করেছেন, রক্ত দিয়েছেন, সেই ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যখন একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে, তাতে যাতে আমরা কাঁটা না বিছাই। সবার প্রতি এই আহ্বান জানাই।’
তিনি বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আপনাদের এই কথা বলতে পারি, যদি জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দেয়, গুম প্রতিরোধের জন্য, গুমের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রথমে যা যা করতে হয়—আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর—সবকিছু করা হবে। আমরা সেই বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছি, যেখানে কোনো ব্যক্তি গুমের শিকার হবে না।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমাকে একটা গুপ্তগুহায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন যদি আমার চোখ বন্ধ না থাকত, তাহলে হয়তো আমার বিশ্বাস হতো না যে এখানে মানুষ থাকতে পারে। তবে রুমের ভিতরে চোখ খোলা থাকত। একদিনই কেবল চোখ খোলা রেখে বাইরে নেওয়া হয়েছিল। আমার তারিখ গণনায় সেদিন ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের দিন। তাদের মধ্যে কয়েকজন অফিসার সম্ভবত ছিল সেই অনুষ্ঠানে, আমাকে বলল যে আজ ম্যাডাম পার্টি অফিসের সামনে অনুষ্ঠান করেছে, পহেলা বৈশাখের। আমাকে নিউজ দিতে চাইল যে দেশে এখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘আমি কোনো জবাব দিতাম না। সেদিনই চোখ খোলা রেখে রুমের বাইরে কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখেছিল। কারণ রুমটা পরিষ্কার করতে হবে। রুমটা ছিল ময়লা আর দুর্গন্ধে ভরা, বাতাস চলাচলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পাঁচ ফুট বাই দশ ফুট বা তার চেয়ে ছোট হতে পারে রুমটা। দুই মাস একদিন অর্থাৎ ৬১ দিনের মাথায় আমাকে বের করে যমটুপি ও কালো চশমা পরিয়ে গামছা দিয়ে হাত বেঁধে বলা হলো—আজ আপনাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে, ফিরে আসতে আপনার দু-তিন দিন লাগতে পারে। তবে আমাকে জীবিত ছেড়ে দেবে, সেটা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘তাদের বলতাম, যদি আমার মৃত্যু এখানে হয়, তাহলে আমার লাশটা আমার পরিবারের কাছে ফেরত দিও। তারা কোনো জবাব দিত না। আল্লাহর কাছে সবসময় প্রার্থনা করতাম, যদি আমার হায়াত থাকে, আমাকে ইমানের সঙ্গে জীবন দিও, ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দিও। আর যদি এখানেই আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমাকে ইমানের মৃত্যু দিও। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য প্রার্থনা করতাম।’
‘আমি খুব বিশ্বাসী মানুষ, আমি অনেক কিছু দেখেছি। সে জন্য অনেক অবিশ্বাসী মানুষকে বলি—আমি শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব চোখ দিয়ে দেখিনি, কিন্তু আমি অনুভব করেছি, আমি অনেক কিছু জেনেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছেন। সেগুলো আমি বাস্তব জীবনে পেয়েছি। এটা হয়তো যারা বিশ্বাস করতে চাইবেন, তারাই বিশ্বাস করতে পারবেন। এটা অনুধাবনের বিষয়।’
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানে গুম হওয়া পরিবারের মধ্যে নতুন কেউ যোগ হয়নি, এটা সুসংবাদ। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দিনের রাজনীতিবিদরা যাতে নিশ্চিত করেন আগামী দিনে যেন গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের এমন কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না হয়। আসলে সে জন্যই আমরা এখানে অনবরত সংগ্রাম করে যাচ্ছি।’