বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আনন্দে টইটুম্বুর। বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগ আর্জেন্টিনার, অন্য ভাগ ব্রাজিলের। বিশ্বকাপের উত্তেজনা মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের আড্ডা পর্যন্ত।
এবারের বিশ্বকাপের মূল উত্তেজনা শুরু হয় ১১ জুন। শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে ছিল তুমুল উচ্ছ্বাস। প্রতিটি ম্যাচ ঘিরে চলেছে বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনা আর বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি। তবে সেই আনন্দে বড় ধাক্কা আসে যখন ব্রাজিল শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয়। হেক্সা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা দলটির এমন বিদায়ে বাংলাদেশের অসংখ্য সমর্থক হতাশ হয়ে পড়েন। অনেকেরই আশা ছিল, অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত দলটি অনায়াসে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা নিজেদের নৈপুণ্যে এখনো টিকে রয়েছে। তবে তাদের পথও খুব সহজ ছিল না। কঠিন লড়াই পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রতিপক্ষ সমর্থকদের খোঁচাও থামেনি। 'আমরা হারতে হারতে জিতেছি, তোমরা তো তাও পারলে না'—এ ধরনের ঠাট্টা-মশকরা বিশ্বকাপের চিরচেনা দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনার ইতিহাস অনেক পুরোনো। যদিও ইউরোপ, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেরও সমর্থক রয়েছেন, তবুও সবচেয়ে বেশি আবেগ ঘিরে থাকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে। বিশ্বকাপ এলেই যেন পুরো দেশ এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুধু নিজের দলকে সমর্থন নয়, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের যুক্তিতে হারানোর এক অলিখিত প্রতিযোগিতাও শুরু হয়।
কখনো কখনো সেই তর্ক সীমা ছাড়িয়ে হাতাহাতি বা সংঘর্ষেও রূপ নেয়। অতীতের বিশ্বকাপগুলোতে এমন ঘটনার কারণে আহত কিংবা প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। খেলার আনন্দ যেন কখনোই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ না হয়—এটাই সবার প্রত্যাশা।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কেনার হিড়িক পড়ে। বাড়ির ছাদ, রাস্তার মোড়, মাঠ-ঘাট, এমনকি গ্রামের সরু পথও বিভিন্ন দেশের পতাকায় রঙিন হয়ে ওঠে। কে কত বড় পতাকা টানাতে পারে, তা নিয়েও চলে নীরব প্রতিযোগিতা। তবে পতাকা টানাতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে, যা আনন্দের মাঝেও সতর্কতার বার্তা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশ্বকাপের উত্তাপ কম নয়। বিভিন্ন দলের সমর্থকরা নতুন নতুন গ্রুপ খুলে নিজেদের দলের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। কনটেন্ট নির্মাতারাও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মজার তর্ক-বিতর্ক নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন, যা লাখো দর্শকের মনোযোগ কাড়ছে।
এমনই একটি জনপ্রিয় ভিডিওতে দেখা যায়, দুই সমর্থকের তর্কের মাঝে আরেক বন্ধু শান্তভাবে বোঝাচ্ছেন—আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের মানুষ কেউই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের চেনে না। অথচ আমরা তাদের সমর্থন করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করছি। কেউ আহত বা নিহত হলেও সেই দেশের কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে না। খেলাকে খেলা হিসেবেই দেখা উচিত। শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধু নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। এমন বার্তাধর্মী ভিডিওগুলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলছে।
বাংলাদেশে ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ মূলত লিওনেল মেসি ও নেইমার জুনিয়রকে ঘিরেই আবেগ প্রকাশ করেন। অনেকেই এই দুই তারকার বাইরে অন্য খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তেমন জানেন না। তবে যারা সারা বছর ইউরোপিয়ান লিগ, কোপা আমেরিকা কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অনুসরণ করেন, তারা বিশ্ব ফুটবলের আরও অনেক তারকা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন।
এবারের বিশ্বকাপেও কয়েকজন তারকা ফুটবলার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি'অর জয় করেছেন এবং বিশ্বকাপও জিতেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সংস্থা (IFFHS) তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ ছাড়া পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র এবং নরওয়ের দুর্দান্ত স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের মধ্যে রয়েছেন। তাদের নৈপুণ্য, গতি ও গোল করার অসাধারণ দক্ষতা ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে চলেছে।
ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনার স্বর্ণালি প্রজন্মের কথাও আজও সমানভাবে স্মরণীয়। দিয়েগো ম্যারাডোনা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, দিয়েগো সিমেওনে, রবার্তো আয়ালা, হার্নান ক্রেসপো, ফার্নান্দো রেদোন্দো, আরিয়েল ওর্তেগা এবং হাভিয়ের জানেত্তির মতো কিংবদন্তিরা নিজেদের প্রতিভা দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
বিশ্বকাপ শেষ হলে ট্রফি জয়ের আনন্দ কিংবা হারের বেদনা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ, বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি আর স্মৃতিগুলো থেকে যায় আরও অনেক দিন। তাই বলা যায়, বিশ্বকাপে কোনো দল বিদায় নিলেও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা কখনো বিদায় নেয় না। ব্রাজিলের বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যেন টিকে আছে—আধেক বাংলাদেশ।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন