ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

খেলোয়াড়দের বেতন কি আমাদের ট্যাক্সের টাকায়? 

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০২:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা সরকারের কোষাগার থেকে অর্থাৎ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেওয়া হয়।

কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ স্পষ্ট করেছেন যে, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। খেলোয়াড়দের আয়ের প্রধান উৎস আইসিসি, ফিফা এবং বিভিন্ন করপোরেট স্পন্সর।

তাহলে প্রশ্ন জাগে— আইসিসি বা ফিফার মতো সংস্থাগুলো এত টাকা পায় কোথায়? আর বড় বড় কোম্পানিগুলোই বা কেন শত শত কোটি টাকা ঢালছে এই খেলাধুলায়? চলুন দেখে নেওয়া যাক ক্রীড়া বিশ্বের এই বিশাল অর্থনৈতিক চক্রটি কীভাবে কাজ করে।

১. সম্প্রচার স্বত্ব: আয়ের প্রধান ইঞ্জিন

আইসিসি বা ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে টেলিভিশন এবং ডিজিটাল সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে। ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় ছিল প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার, যার সিংহভাগই এসেছে টিভি স্বত্ব থেকে। 

একইভাবে আইসিসি তাদের ২০২৪-২৭ চক্রে মিডিয়া রাইটস থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কোটি কোটি দর্শক টিভি বা অ্যাপে খেলা দেখেন বলেই সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে দ্বিধা করে না।

২. স্পন্সরশিপ: বিজ্ঞাপনের চেয়েও বেশি কিছু

কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস বা এমিরেটসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো কেন খেলাধুলায় বিনিয়োগ করে? উত্তর হলো— 'গ্লোবাল রিচ'। একটি বড় টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তারা একই সাথে এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। 

এটি কেবল বিজ্ঞাপন নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্র্যান্ডিং বিনিয়োগ। স্পন্সরশিপ থেকে প্রাপ্ত অর্থ আইসিসি ও ফিফার আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস।

৩. আইসিসি ও ফিফার রাজস্ব বণ্টন

এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো টুর্নামেন্ট থেকে যে আয় করে, তার একটি বড় অংশ সদস্য দেশগুলোর বোর্ডকে (যেমন: বিসিবি বা বিসিসিআই) প্রদান করে।

বিসিবির আয়: সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবি সংশ্লিষ্টদের মতে, বিসিবির বার্ষিক রাজস্বের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে আইসিসি থেকে।

ভারতের আধিপত্য: দর্শক সংখ্যার ভিত্তিতে আইসিসির আয়ের ৩৮.৬ শতাংশই পায় ভারত (বিসিসিআই), যেখানে অস্ট্রেলিয়া পায় মাত্র ৬.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, যে দেশের দর্শক যত বেশি, সেই দেশের বোর্ডের আয় তত বেশি।

৪. টিকিট ও মার্চেন্ডাইজ

স্টেডিয়ামে গ্যালারি ভর্তি দর্শক মানেই টিকিটের টাকা। এছাড়া অফিশিয়াল জার্সি, ক্যাপ এবং ফুটবল-ক্রিকেটের বিভিন্ন স্মারক পণ্য বিক্রি থেকেও মোটা অঙ্কের রাজস্ব আসে। 

ফিফা বা আইসিসির ভিডিও গেমের লাইসেন্সিং চুক্তিও এই আয়ের একটি বড় অংশ।

৫. ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ক্লাব ফুটবলের অর্থনীতি

আইপিএল বা বিপিএলের মতো লিগে খেলোয়াড়দের বেতন সরকার বা বোর্ড দেয় না; দেয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা। তারা এই টাকা তুলে আনে স্পন্সর এবং লিগের কেন্দ্রীয় আয়ের ভাগ থেকে। 

ফুটবলের ক্ষেত্রে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা লা-লিগার ক্লাবগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক মডেল, টিকিট এবং বৈশ্বিক ফ্যানবেজ থেকে খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী বেতন পরিশোধ করে।

এদিকে, পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খেলাধুলার এই অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন সাধারণ দর্শক। আপনি যখন টিভিতে খেলা দেখছেন, তখন সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য বাড়ছে। আপনি যখন স্পন্সর করা কোনো পণ্য কিনছেন, তখন সেই কোম্পানি আরও বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হচ্ছে।

সুতরাং, খেলোয়াড়দের পকেটে সরাসরি সরকারি টাকা না গেলেও, ভক্তদের ভালোবাসা এবং সময়ের বিনিয়োগই মূলত এই বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রেখেছে। দর্শকদের চাহিদা আছে বলেই মাঠের লড়াই আজ আর কেবল খেলা নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম লাভজনক একটি শিল্প।