ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রয়টার্সের প্রতিবেদন

ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে ‘আইনত’ টোল আরোপ করতে পারে?

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০১:২৭ পিএম
প্রতীকী ছবি ।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সহযোগিতায় নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিতে হরমুজের ওপর টোল আরোপ করে প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের চেষ্টা করছে ইরান। নিচে টোল আদায় সংক্রান্ত আইন এবং এর বিরোধিতাকারী দেশগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা হলো।

হরমুজ প্রণালি কী:

হরমুজ হলো ইরান ও ওমানের জলসীমায় অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। সম্ভবত এটা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলের পথ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়।

জলপথটির দৈর্ঘ্য ১০৪ মাইল তথা ১৬৭ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এর প্রস্থ একেক জায়গায় একেক রকম। সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে এটি অভ্যন্তরীণ ও বহির্গামী জাহাজ চলাচলের জন্য ২-মাইল প্রশস্ত চ্যানেল সরবরাহ করে, যা একটি ২-মাইল বাফার জোন দ্বারা বিভক্ত।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর, ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ বন্ধের পূর্বশর্ত হিসেবে জলপথটি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপের ঘোষণা দেয় তেহরান। তবে এ ঘোষণার পর, এখন পর্যন্ত কোন টোল ইরান নিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

কোন আইনে হরমুজে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হয়?

১৯৮২ সালে সমুদ্রের ব্যবহার, সীমানা নির্ধারণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার আইনি কাঠামো তৈরি করে জাতিসংঘ। যা ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্যা সি’ নামে পরিচিত। ১৯৯৪ সাল থেকে আইনটি কার্যকর হয়।

‘কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্যা সির’ ৩৮ অনুচ্ছেদ হরমুজসহ বিশ্বের শতাধিক প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলোকে নির্বিঘ্নে ‘ট্রানজিট যাতায়াতের’ অধিকার প্রদান করে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো প্রণালীর লাগোয়া দেশ তার সীমান্ত থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ‘আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার’ মধ্যে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তবে ‘নিরাপদ যাতায়াত বাধাগ্রস্থ করার’ অনুমতি দেওয়া হয়নি তাদের।

সাধারণত কোন দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা হুমকি না থাকলে যেকোন যাতায়াতকে নিরাপদ হিসেবে গণ্য করা হয়। আলবেনিয়া ও গ্রিসের উপকূল বরাবর অবস্থিত করফু প্রণালী সম্পর্কিত ১৯৪৯ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি মামলার মূল ভিত্তি ছিল এই নিরাপদ যাতায়াতের ধারণাটি। চুক্তি অনুযায়ী সামরিক কার্যকলাপ, ভয়াবহ দূষণ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং মাছ ধরা অনুমোদিত নয়।

প্রায় ১৭০টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্যা সি’ অনুমোদন করেছে। চুক্তিতে সই করেনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এ চুক্তিটি সামুদ্রিক চলাচলের স্বাধীনতা প্রদানকারী প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হয়ে উঠেছে, নাকি তা কেবল অনুমোদনকারী দেশগুলোর জন্যই প্রযোজ্য, এই প্রশ্ন অমিমাংসিত থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্যা সি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে বা সাধারণত সেভাবেই বিবেচিত হয়। কিছু অনুমোদন না করা দেশ যুক্তি দিতে পারে যে, যেহেতু তারা ক্রমাগত ও ধারাবাহিকভাবে আপত্তি জানিয়ে আসছে, তাই তাদের এই চুক্তি অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। ইরান যুক্তি দিয়েছে যে তারা এই ধরনের আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র টোল আদায়ের ক্ষেত্রে ইরানের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ইরানের টোল আদায়কে কিভাবে মোকাবিলা করা যায়:

‘কনভেনশন অন দ্যা ল অব দ্যা সি’ কার্যকর করার কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল এবং নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দিতে পারলেও তা কার্যকর করতে পারে না।

টোল মোকাবিলার জন্য দেশ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যান্য সম্ভাব্য উপায় রয়েছে।

কোনো ইচ্ছুক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহের জোট চুক্তিটি কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ টোলের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব পাস করতে পারে।

কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালী থেকে তাদের পণ্য চালান অন্য পথে ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং তা করতে শুরুও করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান টোল দিলে ইরান সরকার উপকৃত হবে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে দেশগুলো। পাশাপাশি টোল প্রদানে ইচ্ছুক কোম্পনিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে তারা।