মেসির রেকর্ড গড়া ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করল আর্জেন্টিনা। জাদুকরি এক ফ্রিকিকে বিশ্বকাপে টানা ৭ ম্যাচে গোলের মহাকীর্তি গড়লেন মেসি। শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা সহজ জয় দিয়েই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে। জর্ডানকে হারিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা।
অনুমিতভাবে একাদশে অনেক পরিবর্তন আনলেন লিওনেল স্কালোনি। তবে ‘নিয়ম রক্ষার’ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে প্রত্যাশিত জয় পেল আর্জেন্টিনা। শেষ আধা ঘণ্টা খেলে ফ্রিকিকে চমৎকার গোলে দারুণ এক রেকর্ড গড়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ডালাসে বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে ৩-১ গোলে জিতেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তৃতীয় দল হিসেবে এবারের আসরে গ্রুপ পর্বে ৯ পয়েন্ট পেয়েছে আর্জেন্টিনা।
শিওভানি লো সোলসো দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর সফল স্পট কিকে ব্যবধান বাড়ান লাউতারো মার্তিনেস। শেষ দিকে জালের দেখা পান মেসি। শুরু থেকেই বল দখলে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে শিরোপাধারীরা। ষষ্ঠ মিনিটে জালে বল পাঠান লো সোলসো। কিন্তু অফসাইডের জন্য মেলেনি গোল। তবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯তম মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শটে দূরের পোস্ট দিয়ে জাল খুঁজে নেন লো সোলসো।
৩১তম মিনিটে সফল স্পট কিকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মার্তিনেস। গোলরক্ষক ডাইভ দেন উল্টো দিকে। ঠিক দিকে ডাইভ দিলেও হয়তো গতিময় শটের নাগাল পেতেন না তিনি। ডি বক্সে মার্কোস সেনেসিকে ফাউল করায় পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ফ্রিকিক থেকে হেড একটুর জন্য লক্ষ্যে রাখতে পারেননি নিকোলাস ওতামেন্দি। দূরের পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায় বল। দুই মিনিট পর মার্তিনেসের বাড়ানো বলে সুযোগ আসে হুলিয়ান আলভারেসের সামনে। বল পায়ে এগিয়ে গিয়ে সরাসরি গোলরক্ষক বরাবর শট নিয়ে সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি। আসরে নিজের প্রথম গোলের জন্য অপেক্ষা বাড়ে তার।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জালের দেখা পান আলভারেস। মার্তিনেসের কাটব্যাকে জাল খুঁজে নেন তিনি। কিন্তু আক্রমণের শুরুতে মার্তিনেস অফসাইডে থাকায় মেলেনি গোল। ৫৪তম মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে মার্তিনেসের শট বেরিয়ে যায় ক্রসবার ছুঁয়ে! পরের মিনিটে খেলার ধারার বিপরীতে গোল করে ব্যবধান কমায় জর্ডান। এহসান হাদ্দাদের ক্রসে বদলি খেলোয়াড় মৌসা আল-তামারি খুঁজে নেন জাল। ঝাঁপিয়ে হাত ছোঁয়ালেও বল ঠেকাতে পারেননি এমিলিয়ানো মার্তিনেস। পাঁচ মিনিট পর তুমুল করতালির মধ্যে মাঠে নামেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৬৪তম মিনিটে ফ্রিকিক লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি।
ম্যাচের ৮০তম মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে গোল করেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষের ডি বক্সের বাইরে প্রায় ২৫ গজ দূরে ফাউলের শিকার হওয়ার পর সরাসরি ফ্রিকিক থেকে বল জালে পাঠান তিনি। শটটি খুব বেশি কোনায় না গেলেও জর্ডানের গোলরক্ষক ভুল দিকে ঝাঁপ দেওয়ায় বল জালে জড়িয়ে যায়। গোলরক্ষক ভেবেছিলেন দেওয়ালের ওপর দিয়ে শট নেবেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সেটা করেননি তিনি, দেওয়ালের পাশ ঘেঁষে বাঁকানো শট খুঁজে নেয় জাল! চেষ্টা করলেও পরে আর গোল করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আগামী শনিবার মায়ামিতে শেষ বত্রিশে এই আসরের চমক কেইপ ভার্দের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির ষষ্ঠ গোল। বিশ্বকাপের মূল পর্বে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯। পাশাপাশি টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে নতুন একটি রেকর্ডও গড়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
চমৎকার ফ্রিকিক গোলে মেসির আরও অনেক কীর্তি : মাঠে নামলেই যেন নতুন কোনো রেকর্ড ধরা দিচ্ছে লিওনেল মেসির হাতে। প্রতিদিনই গড়ছেন কোনো না কোনো কীর্তি। জর্ডানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি নেমে খেললেন শেষ ৩০ মিনিট। চমৎকার এক ফ্রিকিকে গোল করে রেকর্ডের আরও অনেক পাতায় জায়গা করে নিলেন তিনি। আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচে মেসি ও আর্জেন্টিনার অর্জনগুলো তুলে ধরা হলোÑ ৭: প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে টানা ৭ ম্যাচে গোল করেছেন লিওনেল মেসি।
১৯: মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আগেই হয়েছিলেন মেসি। জর্ডানের বিপক্ষে আরও ১ গোল করে সংখ্যাটা ১৯-এ নিলেন তিনি।
৫: পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের যেকোনো আসরে গ্রুপ পর্বে ৬ গোল করেছেন মেসি। ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর পর প্রথম।
৬: বিশ্বকাপের সবশেষ ৬০ বছরের ইতিহাসে ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে সরাসরি ফ্রিকিকে ২টি গোল করেছেন লিওনেল মেসি।
৬: ডি বক্সের বাইরে থেকে এখন পর্যন্ত ৬ গোল করেছেন লিওনেল মেসি। সবশেষ ৬০ বছরে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ডি বক্সের বাইরে এটিই সর্বোচ্চ। ৫ গোল নিয়ে একসময় শীর্ষে ছিলেন ব্রাজিলের রিভেলিনো।
৪: চতুর্থ দল হিসেবে সরাসরি ফ্রিকিক থেকে একাধিক গোল করেছে আর্জেন্টিনা। সবশেষ ৬০ বছরে ১৯৬৬ সালে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপে সরাসরি ফ্রিকিক থেকে একাধিক গোল করেছিল ব্রাজিল। ১৯৭৪ সালে জায়ারের বিপক্ষে যুগোস্লাভিয়া এবং ২০১০ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে জাপান এই কীর্তি গড়ে।
৫: পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সবগুলো ম্যাচে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। এর আগে ১৯৩০, ১৯৯৮, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সবগুলো ম্যাচে জয় পেয়েছিল। আগের চারবারের শিরোপা জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা। ১৯৩০ ও ২০১৪ আসরে খেলে ফাইনালে।
৯: বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত আছে আর্জেন্টিনা। সবশেষ ২০২২ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ হেরেছিল। ২০০২ থেকে ২০১০ আসরে সর্বোচ্চ ১০ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা।
৩৮: বিশ্বকাপে নিজের নবম ম্যাচে এসে প্রথম গোলের দেখা পেয়েছেন লাউতারো মার্তিনেস। প্রথম গোলের দেখা পেতে ১৭ শট নিতে হয়েছে। এ ছাড়া আর্জেন্টিনার জার্সিতে মার্তিনেসের ৩৮তম গোল, দেশটির হয়ে চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতাও এখন তিনি।
১৫৪: জর্ডানের বিপক্ষে ১৫৪টি পাস দিয়েছেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস। বিশ্বকাপের যেকোনো ম্যাচে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি পাসের সংখ্যা। সবশেষ ৬০ বছরে বিশ্বকাপে যেকোনো ফুটবলারের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ পাসের সংখ্যা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন