ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

জুলাই যোদ্ধাদের স্বপ্নভঙ্গ

ফারুক আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ১২:১৪ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ঢাকার একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন সালমান রাহাত। গত দুই বছরে তিনি অসংখ্য চাকরির আবেদন করে লিখিত পরীক্ষা দিলেও চাকরি জোটেনি। জুলাই আন্দোলনের সময় জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলেন।

তার বিশ্বাস ছিল, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে দুর্নীতি, দখলবাজির সংস্কৃতি ভেঙে সবার যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে। তরুণদের জন্য খুলবে কর্মসংস্থানের  নতুন দুয়ার। কিন্তু দুই বছর পর বাস্তব পরিস্থিতি ঠিক তেমনটা হয়নি।

সালমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় থাকলেও দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন করেনি। এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়া; তা সরকারি বা বেসরকারি হোক। রাজনীতির পট পরিবর্তন হলেও বাস্তব কোনো পরিবর্তন এখনো দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে গণঅভ্যুত্থানে আহতদের অনেকেই দীর্ঘ সময় পার হলেও সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা, হেলথ কার্ড এবং জরুরি আর্থিক সহায়তার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে দাবি জুলাই যোদ্ধাদের।

আহতদের অভিযোগ, অনেকে সরাসরি আন্দোলনে যোগ না দিয়েও সুযোগ নিচ্ছে। এমনকি ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীও নিজেকে জুলাই-আহত দাবি করে ভাতা গ্রহণ করছে। তথ্য অনুসারে, ‘গণঅভ্যুত্থানে আহত’ দাবিতে জমা পড়া নতুন আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ে প্রায় ২০০ আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত করে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এ ছাড়া প্রায় ৬০০ আবেদনে তথ্যগত অসংগতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন এবং শহিদের নামে আহত হিসেবে আবেদনসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের অভিমত, এসব পুরোনো সংস্কৃতি চালুর ইঙ্গিতবাহী।

দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অসংখ্য তরুণের কাছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো বলে জানান অনেক জুলাইযোদ্ধা।

তাদের ভাষ্য, ধীরে ধীরে যেন পুরোনো আবহেই ফিরে যাচ্ছে দেশ। এটা আমাদের কাম্য ছিল না। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ২৪-এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, অভ্যুত্থানের দুই বছর পরে এসে মনে হচ্ছে, সেই আশা তো পূরণ হয়ইনি, বরং হতাশাই যেন আমাদের একমাত্র প্রাপ্তি।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি প্রক্রিয়ার সূচনা করতে পারে; কিন্তু কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আয় বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক ফলাফল সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করে। যদিও জুলাইয়ের বড় অর্জন হলো গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসা। মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার গঠন করা।

সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং আন্দোলনে আহত জুলাইযোদ্ধাদের হত্যা ও মারধর করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ পুরস্কার ঘোষণার ঘটনা ঘটছে। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জুলাইযোদ্ধারা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নড়াইল জেলা শাখার সদস্যসচিব মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, জুলাই মাস আসায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের টার্গেট করে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের পলাতক কয়েকজন নেতাকর্মী ফেসবুকে বিভিন্ন উসকানিমূলক লেখালেখি ও ভিডিও পোস্ট করছে। এগুলো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জীবনের জন্য চরম হুমকি।

তিনি বলেন, আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেতা ও অন্তর্বর্তী সরকার যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ না করায় এমন ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং আর্থিক সহায়তা নিয়ে অসন্তোষ গভীর হচ্ছে। আহতদের একটি অংশের অভিযোগ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ধীরগতি এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছেন না।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্থায়ী কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাদের মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্য তখনই পাওয়া যাবে, যখন তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন। সরকারের মেয়াদ এখন চার মাস। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা, ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও রয়েছে। সরকার সার্বিক বিষয়েই পদক্ষেপ নিচ্ছে। জুলাইসংক্রান্ত বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অসংগতি আমার নজরে পড়েনি।’

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা। যে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল এবং কার্যত নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, সেটিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা, একটি নির্বাচিত সরকার গঠন করা এবং সেই উদ্যোগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে নির্বাসনে পাঠানোই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

জুলাইয়ের স্বপ্ন ও বাস্তবতা বিষয়ে জাতীয় যুবশক্তির মুখ্য সংগঠক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি রিফাত রশিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি যে, শেখ হাসিনা গেলেও হাসিনার যে ফ্যাসিবাদী রেজিম (সাম্রাজ্য), হাসিনার যে ফ্যাসিবাদী স্ট্রাকচার, সেই স্ট্রাকচার কিন্তু বলবৎ আছে এবং সেই স্ট্রাকচার এখনো ফাংশনাল। ফলে আমরা আসলে নতুন যে রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, সেই রাষ্ট্র পাইনি। তবে কিছু পরিবর্তন তো হয়েছে। এই যে বাকস্বাধীনতা, আপনার সঙ্গে আমি যে কথা বলতে পারছি এবং আমি জানি যে, এর জন্য আমাকে গুম করা হবে না- এটাও আসলে আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। এই যে ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে আমরা সরে গিয়ে একটি শক্তিশালী বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করতে পারছি, যার সঙ্গে ইচ্ছা মিটিং করতে পারছি, কথা বলতে পারছি-এটাও আসলে অনেক বড় প্রাপ্তি।

তিনি আরও বলেন, জুলাই তো আসলে কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিকে ছিল না। জুলাই ছিল মানুষের মনে, মগজে, আত্মায়, সত্তায়। সেই জায়গার মধ্যে যদি আমরা জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তাহলে শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের যে স্পিরিট, জুলাইয়ের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা একদিন না একদিন বাস্তবায়িত হবে।

গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও যে উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মূলত এই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এ ক্ষেত্রে দায়ের একটি বড় অংশ অন্তর্বর্তী সরকারকে নিতে হবে। তারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল এবং তাদের মূল দায়িত্ব ছিল, মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমরা সেটি দেখতে পাইনি; বরং বিদেশিদের মদতপুষ্ট একটি এনজিওগোষ্ঠী রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেরা কীভাবে আরও বেশি সুবিধাভোগী হওয়া যায়, সেই প্র্যাকটিস করেছে।

তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও একধরনের ভোগবিলাসিতার প্রবণতা দেখা গেছে।

আবু হানিফ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের যে স্পিরিট, সেটি ধারণ করতে না পারলে প্রত্যেকের পরিণতিই আওয়ামী লীগের মতো হতে পারে। সুতরাং, কেউ যদি জুলাইকে অস্বীকার করতে চায় কিংবা জুলাইয়ের চেতনাকে অবজ্ঞা করতে চায়, তাহলে এ দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। কারণ, একাত্তরের পর এ দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধভাবে এবং সম্মিলিত শক্তিতে এই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করেছে।

জুলাই যোদ্ধারা বলছেন, জুলাই আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম ছিল না, এটি তরুণদের কাছে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, স্বচ্ছ প্রশাসন, মেধাভিত্তিক সুযোগ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দুই বছর পর সেই প্রত্যাশার কিছু অংশ বাস্তব আলোচনায় এসেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি।