ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

জন্মভূমি মাশহাদে খামেনিকে দাফন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ০৬:০১ এএম

তীব্র তাপদাহ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার স্লোগানে মুখরিত হয়ে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন লাখ লাখ ইরানি নাগরিক। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর, প্রায় সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তার শাসনের অবসান ঘটে। দীর্ঘ ছয় দিন ধরে চলা টানা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শোকযাত্রার চূড়ান্ত পর্ব হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তার মরদেহ উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে দাফন করা হয়। মাশহাদ শহর খামেনির জন্মস্থান। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেই হামলায় খামেনির সঙ্গে নিহত তার কন্যা, নাতনি ও জামাতাকেও গতকাল একইসঙ্গে দাফন করা হয়।

মাশহাদের গভর্নর হাসান হোসেইনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের সমাগম আশা করা হয়েছিল। মাশহাদে যখন খামেনির কফিন এসে পৌঁছায়, তখন সেখানকার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শোকার্ত মানুষদের এই তীব্র গরম থেকে স্বস্তি দিতে পুরো রাস্তায় পানি ছিটানোর বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় দাফন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে জানাজার দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতার কারণে তা পিছিয়ে দুপুর ২টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ইরানের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত ইমাম রেজা মাজারে খামেনির শেষ জানাজা পরিচালনা করেন ১০১ বছর বয়সী কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ হোসেইন নুরি হামেদানি। এর আগে ইরাকের নাজাফ এবং কারবালা শহরে অনুষ্ঠিত শোকযাত্রায় ২৩ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন। একে দেশটির আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণজমায়েত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত জনতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে ‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা করো) স্লোগান দেন। তবে এই বিশাল আয়োজনেও খামেনির ছেলে এবং তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির কোনো দেখা মেলেনি। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি এখনো একবারের জন্যও জনসমক্ষে আসেননি। এমনকি নিজের পিতা ও স্ত্রীর জানাজাতেও তাকে দেখা যায়নি। গুঞ্জন রয়েছে, যে বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হয়েছিলেন, সেই একই হামলায় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হন এবং বর্তমানে গোপন স্থানে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে রাজনীতিক বিশ্লেষকদের মতে, শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ইসরায়েলি ও মার্কিন গুপ্তহত্যার হুমকি থেকে বাঁচতেই নতুন এই নেতাকে সম্পূর্ণ গোপনে রাখা হয়েছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন এমন একসময়ে সম্পন্ন হলো যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ফের তীব্র যুদ্ধের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। এর আগে খামেনির জানাজা উপলক্ষে মার্কিন বাহিনী সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জের ধরে গত দুই দিন ধরে দুই দেশ হামলা-পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

গত বুধবার রাতে মার্কিন বিমান হামলায় তেহরান-মাশহাদ সংযোগকারী প্রধান রেললাইনটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও অচল হয়ে পড়লেও খামেনির দাফন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারেনি। ইরাকের বিশাল জনসমুদ্রের কারণে অনুষ্ঠান সূচিতে প্রায় আট ঘণ্টার বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে প্রয়াত এই নেতার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে মাশহাদের পবিত্র মাটিতে শায়িত করা হয়।

দুই রাতে ব্যাপক হামলা, নিহত অন্তত ১৪ : আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের দিনই সংঘাত আরও তীব্র হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, টানা দ্বিতীয় রাতের অভিযানে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে মোট ৯০টি সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই রাতের মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের ইরানশাহর বিমানবন্দরের একটি ভবনে হামলায় একজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

পারমাণবিক স্থাপনার কাছে হামলার দাবি : ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। প্রাদেশিক প্রশাসনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানা এলাকায় কয়েকটি প্রজেক্টাইল আঘাত করে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি।

একই সময়ে বুশেহর শহরে দুটি বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে দেশটিজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা অন্তত আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এতে কিছু ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়লেও কোনো হতাহত হয়নি।

জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ১০টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনও দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে।

এদিকে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মার্কিন চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের প্রথম পর্যায় হিসেবে আইআরজিসির নৌ এবং অ্যারোস্পেস বাহিনীর যোদ্ধারা কুয়েতের আরিফান এবং আল আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জাফাইর এবং শেখ ইসা ঘাঁটিতে একটি যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করেছে। ইরানজুড়ে শত্রুপক্ষের হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।’ এতে আরও বলা হয়, ‘যদি শত্রুপক্ষ ফের এমন আগ্রাসন চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঘাঁটিতেও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা : সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তবে তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রই গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে এবং মিথ্যা অজুহাতে নতুন করে হামলা চালাচ্ছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকা-কে ‘যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন’ এবং ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে রেলসেতু ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলারও অভিযোগ তুলেছে তারা।

নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমে গেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র ২৩টি কার্গো জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করেছে, যা আগের দিনের ৩৬টি জাহাজের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

আলোচনার সম্ভাবনায়ও কাটেনি অনিশ্চয়তা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান এখনো একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। তবে তারা সেই সুযোগ পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানÑ কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে যেতে চায় না। তবে নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরতে উভয় দেশই সীমিত সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে, নাকি সংঘাত আরও বিস্তৃত হবেÑ তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।