ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত জনজীবন

চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০ মৃত্যু

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

চট্টগ্রাম বিভাগে গত পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলছে, দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ, চাল ও শিশুখাদ্য বাবদ জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের ক্ষয়ক্ষতি ও জেলা প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। গত পাঁচদিনে রাঙামাটিতে ৬০টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারে, সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় পাঁচজন করে এবং রাঙ্গামাটি জেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

পাঁচ জেলায় ১৪২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত : বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য পাঁচ জেলায় মোট এক হাজার ৪২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৪১১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ৩৪০ জন, রাঙ্গামাটিতে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ২০৬ জন, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৭৫৫ জন এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুই হাজার ১৭৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে কক্সবাজার জেলায় ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও সেখানে বর্তমানে কোনো আশ্রিত লোক নেই। দুর্গতদের সহায়তায় গত ৭ ও ৯ জুলাই দুই দফায় বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এর মধ্যে গত ৭ জুলাই প্রতিটি জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১০ লাখ টাকা করে মোট ৫০ লাখ টাকা নগদ এবং ২০০ টন করে মোট এক হাজার টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৯ জুলাই শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা হিসেবে চট্টগ্রামে ২৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ২০ লাখ টাকা এবং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

একই দিনে চট্টগ্রামে ৩০০ টন, কক্সবাজারে ২৫০ টন এবং বাকি তিন জেলায় ২০০ টন করে মোট এক হাজার ১৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের এই পাঁচ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বহু পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনগুলোর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নিয়মিত মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়।

পাশপাশি, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষদের জন্য সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং শিশু খাদ্যসহ তিন বেলা খাবারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

টানা ৫ দিনের দুর্যোগে বিপর্যস্ত কক্সবাজার : টানা পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও উত্তাল সমুদ্রের তা-বে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা কক্সবাজার। গত কয়েক দিনের দুর্যোগে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে অন্তত ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা সেন্ট মার্টিন-দ্বীপসংলগ্ন উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ। অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রামÑ প্রায় সর্বত্রই দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন এলাকায় ভেঙে পড়েছে সড়ক, কালভার্ট ও পাহাড়ি সংযোগপথ। নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, অন্তত ৩০ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৬ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী হাজারো রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও লার্নিং সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হলেও অব্যাহত বৃষ্টিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আশ্রয়শিবিরজুড়ে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আরও মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রামে চার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি : টানা পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টিতে গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মুখোমুখি হয়েছে চট্টগ্রাম। পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের অধীন সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক এসব তথ্য জানান।

রাঙামাটিতে ৬০টি পাহাড়ধস : রাঙামাটিতে গত পাঁচ দিনের টানা ভারি বর্ষণে জেলার বিভিন্নস্থানে ৬০টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের ঝুঁকি। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের পাশাপাশি বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্ভাব্য প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলে নেজারত শাখার ডেপুটি কালেক্টর শেখ সালমান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির এসব তথ্য জানা যায়।