ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের শক্তি সুইজারল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৬টায় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। চলতি বিশ^কাপে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে এদিন। দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, কৌশল এবং নকআউট পর্বের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ম্যাচটি হতে পারে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই।
দুই দলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। শেষ ষোলোর সেই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। অতিরিক্ত সময়ের ১১৮তম মিনিটে লিওনেল মেসির অসাধারণ দৌড় ও নিখুঁত পাস থেকে আনহেল দি মারিয়ার করা গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে সুইজারল্যান্ডও একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল এবং শেষ মুহূর্তে পোস্টে লেগে ফিরে আসা একটি হেড তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। ১২ বছর পর আবারও নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল, তাই পুরোনো সেই স্মৃতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আর্জেন্টিনার লক্ষ্য শিরোপা ধরে রাখা : ২০২২ সালে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা ২০২৬-এও টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে এগিয়ে আছে। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি আক্রমণ ও রক্ষণে দারুণ ভারসাম্য বজায় রেখেছে। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে তারা। সেই ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক দৃঢ়তা আবারও প্রমাণ করেছে আলবিসেলেস্তেরা।
এই দলের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসি। আগের মতো গতিময় না হলেও বল নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ সৃষ্টি এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাকে এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবলার হিসেবে এগিয়ে রেখেছে। তার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার তরুণ খেলোয়াড়দের গতি ও সৃজনশীলতা দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড বরাবরের মতোই দলগত ফুটবলের ওপর নির্ভর করছে। তারা হয়তো তারকাখচিত দল নয়, কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, সংগঠিত মাঝমাঠ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের জন্য ইউরোপের অন্যতম কঠিন প্রতিপক্ষ। শেষ ষোলোয় কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে সুইসরা। অধিনায়ক গ্রানিত জাকা দলের মাঝমাঠের নেতৃত্ব দেবেন, আর অভিজ্ঞ রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার আক্রমণ ঠেকানোর বড় দায়িত্ব পালন করবে।
কৌশলের লড়াই, নজর থাকবে সবার : ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের দখল রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাইবে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড নিজেদের রক্ষণকে সুশৃঙ্খল রেখে সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে আঘাত হানার পরিকল্পনা করবে। মাঝমাঠের দখল, সেট-পিস এবং গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স এই ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতায় আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও নকআউট পর্বে ছোট ভুলেও বড় মূল্য চুকাতে হয়। সুইজারল্যান্ড এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে যে, তারা বড় দলকে চাপে ফেলতে পারে। তাই কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা ফেভারিট হলেও এই ম্যাচে কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার এই লড়াইয়ে একদিকে থাকবে মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের শৃঙ্খলাবদ্ধ দলগত ফুটবল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি জন্ম নেবে নতুন কোনো রূপকথাÑ এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৯০ মিনিট কিংবা তারও বেশি সময়ের উত্তেজনাপূর্ণ এক লড়াই শেষে।
দুই দলের পরিচিত মুখ : আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই তারকা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জয় করে ইতোমধ্যে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার অভিজ্ঞতা, ম্যাচ বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তার পাশাপাশি গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বড় ম্যাচে নির্ভরতার প্রতীক। আর এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ আক্রমণ ও মাঝমাঠে দলের মূল চালিকাশক্তি।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে পরিচিত মুখ গ্রানিত জাকা। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইউরোপের অন্যতম অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাঝমাঠে তার পাসিং, নেতৃত্ব এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সুইজারল্যান্ডের বড় সম্পদ। রক্ষণে অভিজ্ঞ রিকার্দো রদ্রিগেজ এবং গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ান। আক্রমণভাগে ড্যান এনডোয়ে, জেকি আমদৌনি ও ব্রিল এম্বোলো প্রতিপক্ষের রক্ষণে গতি ও শক্তির সমন্বয়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। দলটি ব্যক্তিগত তারকার চেয়ে সমষ্টিগত ফুটবলের ওপর বেশি নির্ভর করলেও এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

