ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার

অনাহারে বন্যাদুর্গত মানুষ, অপ্রতুল সরকারি বরাদ্দ

চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৫:৪৬ এএম

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামে গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। জেলার ১৫টি উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অধিকাংশ এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে গেছে। দুর্গত মানুষের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম হওয়ায় অনেক পরিবার অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে কক্সবাজারে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত ১৫ উপজেলার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এবং বন্যার ব্যাপকতার তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি থাকলেও সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ মেট্রিক টন চাল ও ২ লাখ টাকা। সীতাকু-ে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৫ মেট্রিক টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা। লোহাগাড়ায় ২৫ হাজারের বেশি পানিবন্দি মানুষের জন্য ১৫ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আনোয়ারায় ৫ হাজার মানুষের জন্য ২০ মেট্রিক টন চাল ও দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কর্ণফুলীতে ১২ হাজারের বেশি, চন্দনাইশে প্রায় ১৫ হাজার, হাটহাজারীতে ৫ হাজারের বেশি, মীরসরাইয়ে ১০ হাজারের বেশি, বোয়ালখালীতে এক হাজারের বেশি, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় হাজার হাজার মানুষ বন্যার পানিতে আটকা পড়েছেন। সন্দ্বীপ উপজেলায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি থাকলেও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষের মধ্যে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, উপজেলার অধিকাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া চাল ও অর্থ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সীতাকু- উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি এবং ৮০০ জন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তাদের জন্য রান্না করা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

বাঁশখালীতে স্থানীয় ও প্রবাসীদের সহায়তায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন চিকিৎসক ডা. আসিফুল হক। তিনি বলেন, উপজেলার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ এখনো পানিবন্দি। ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার সারা দিনে একবেলাও খাবার জোগাড় করতে পারছে না। অধিকাংশ মাটির ঘর ধসে গেছে। বাস্তব পরিস্থিতি না দেখলে দুর্ভোগের ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব নয়।

কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ দখল, ভরাট এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে বৃষ্টি কমলেও জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। পানি নেমে গেলে এসব পথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতিরও চরম অবনতি হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়ার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গত বৃহস্পতিবার চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ ওয়াকিম এবং একই দিন মাতামুহুরীর কোনাখালী ইউনিয়নে তিন বছর বয়সী শিশু পুষ্পের মৃত্যু হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, নিহত দুই শিশুর পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।

মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চকরিয়ার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপৎসীমার চেয়ে বেশি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, বন্যার ভয়াবহতার তুলনায় ত্রাণের পরিমাণ আরও বাড়ানো না হলে বহু পরিবারকে দীর্ঘদিন দুর্ভোগ ও খাদ্যসংকটের মধ্যে থাকতে হবে।

এদিকে টানা অতিভারী বর্ষণে সৃষ্ট বান্দরবানের বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টি না থাকায় কিছু নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করলেও জেলা শহর ও লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো ৪ থেকে ৫ ফুট পানি জমে রয়েছে। পাহাড়ধস, উপড়ে পড়া গাছ এবং সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

গত ৫ জুলাই থেকে টানা ভারী বর্ষণের পর বৃহস্পতিবার দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়। শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি বন্ধ থাকলেও জেলা শহরের আর্মিপাড়া, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা, কালাঘাটা, ইসলামপুর, ক্যাচিংঘাটা এবং লামা পৌরসভার প্রধান বাজার, চেয়ারম্যানপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো কয়েক ফুট পানি রয়েছে।

বান্দরবান আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ রিঙ্কু দে জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে। আর ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ১০ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত ১২০ ঘণ্টায় মোট ৮৯১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

বন্যার কারণে বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের বাজালিয়া পয়েন্ট দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। এছাড়া রুমা উপজেলায় বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ২ হাজার ১৭৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ এবং বিভিন্ন ছাত্রাবাসে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এদিকে, চলমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বন বিভাগের উদ্যোগে ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষমেলা স্থগিত করা হয়েছে।