গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় বিভিন্ন স্থানে ধস ও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে সামান্য বৃষ্টির পরই সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রক্ষণাবেক্ষণের নামে এখানে সরকারি অর্থের নয়ছয় করা হয়েছে।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’-এর আওতায় প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কার্যাদেশ পেয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন ইয়াসিন হোসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ কাজের শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তারা তা মোটেও আমলে নেয়নি। বরং কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় অত্যন্ত নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি কার্পেটিংয়ের তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই হাতের স্পর্শে পিচ উঠে আসার মতো অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয়রা অনিয়মের চিত্র ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কর্তৃপক্ষ ছিল নীরব।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে গিয়ে সড়কটির করুণ দশা দেখা যায়। সড়কের একাধিক স্থানে কার্পেটিং ভেঙে পিচ ও খোয়া আলাদা হয়ে গেছে। রাস্তার দুপাশে শোল্ডারে দেওয়া মাটির বিশাল অংশ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে বিলীন হয়ে গেছে, যা সড়কটিকে চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
সড়কের পাশের বাসিন্দা ও ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘কাজের শুরু থেকেই এখানে হরিলুট চলেছে। আমরা প্রতিবাদ করলে উল্টো এলাকাবাসীকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো যেখানে অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল, সেখানে অনিয়ম তুলে ধরার দায়ে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই মামলা প্রত্যাহার, প্রকল্পের উচ্চতর তদন্ত এবং বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর ল্যাব টেস্টের দাবি জানাচ্ছি।’
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী রাস্তার দুপাশে প্রায় তিন ফুট প্রশস্ত মাটির শোল্ডার নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে তা করা হয়নি। এজিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে পুরোনো ও নি¤œমানের ইট। কার্পেটিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রাইম কোট ও ট্যাক কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ে বিটুমিনের সঠিক তাপমাত্রা ও পরিমাণ বজায় না রাখায় ১৫ দিনের মাথায় সড়কটির এই নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়কটি নতুন করে কার্পেটিং, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, কাজের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড’-এর স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেন গত ৬ জুলাই আমার দেশ পত্রিকার কোটালীপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজির একটি মামলা দায়ের করেন। সাংবাদিকের দাবি, অনিয়মের সংবাদ ধামাচাপা দিতে এবং দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ইউএনও সাগুফতা হক বলেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমার নজরে আছে। উপজেলা প্রকৌশলী বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। তিনি যোগদান করলে তদন্তের অগ্রগতি জেনে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

