টানা কয়েক দিনের অবিরাম ও রেকর্ডভাঙা অতিভারি বর্ষণ, ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি এবং আসাম থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটজুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি ও স্থানীয় বৃষ্টিপাতের কারণে বিভাগের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যার ফলে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম, হাটবাজার ও ফসলি জমি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কুশিয়ারা নদী সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, অন্যদিকে মৌলভীবাজারের মনু নদী জেলা সদর পয়েন্টে বিপৎসীমার সর্বোচ্চ ৮০ সেন্টিমিটার ও মনু রেল সেতু পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে হবিগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত খোয়াই নদী বল্লা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হচ্ছে। কুশিয়ারা নদী শেরপুর, সুরমা নদী কানাইঘাট, ছাতক ও সুনামগঞ্জ জেলা সদর পয়েন্টে বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই অবস্থান করছে। এ কারণে পুরো বিভাগের নদীতীরবর্তী অববাহিকা ও নিম্নাঞ্চলের কোটি মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া অফিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামে গতকাল রাতে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট আকস্মিক ঢলের পানিতে ডুবে মো. আশরফ মিয়া নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তার ভাসমান মরদেহ শুক্রবার সকালে নিজের বসতঘর থেকে স্বজনরা উদ্ধার করেছেন। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামসহ জেলার সীমান্তবর্তী নিচু এলাকার শত শত বাড়িঘর, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রোপা আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে অনেক উপজেলার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও সদর উপজেলায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কয়েকটি দুর্বল স্থান উপচে এবং ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এতে ১৫টিরও বেশি গ্রামের মানুষ ঘরের আসবাবপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এবং বহু মানুষ রাতেই বাঁধের ওপর ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় এই অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৫ দিনের বর্ধিত পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী সোমবার পর্যন্ত এই অঞ্চলের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে ও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা চলমান পাহাড়ি ঢল আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই টানা বৃষ্টির কারণে সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাহাড়ি ও টিলা এলাকায় ভয়াবহ টিলা ধসের ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় জেলা প্রশাসনগুলোর পক্ষ থেকে ১৬০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় লাল পতাকা টানানো হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য অনবরত মাইকিং করা হচ্ছে। এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সিলেট বিভাগীয় ও সবগুলো জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, যার অংশ হিসেবে সিলেট জেলায় ৫৩৭টি এবং সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে আরও চার শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যেই বন্যাকবলিত কয়েকশ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা সদরে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোলরুম বা নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের সহায়তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার, চাল, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি এবং জরুরি নগদ অর্থ মজুত রাখা হয়েছে বলে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

