রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০১:৩০ এএম

রেস্টহাউসে থেকেও ভাড়া নেন ডিজিএম সুরচিত

শাওন সোলায়মান

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০১:৩০ এএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানির (বিএসসিপিএলসি) উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সুরচিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে সংস্থাটির সরকারি রেস্টহাউসে থাকার অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্বে অবহেলা এবং বেশকিছু গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত জুন মাসে এই কর্মকর্তাকে সাবমেরিন ক্যাবলের কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনে বদলি করা হয়।

কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনে বদলির এক মাসের বেশি পার হলেও এই কর্মকর্তা থাকছেন অতিথিদের জন্য বরাদ্দ রেস্টহাউসে। একেক দিন একেক কক্ষে থাকেন এই কর্মকর্তা। ভোগ করেন অতিথিদের জন্য বরাদ্দ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। একই সঙ্গে অতিথিদের জন্য নিয়োগকৃত বাবুর্চিকে নিজের ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত করেছেন। অনুমতি না থাকলেও বাবুর্চিকে বাধ্য করছেন রেস্টহাউসে তার জন্য আলাদা রান্না থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যক্তিগত কাজ করতে।

তবে রেস্টহাউসে থাকলেও এই কর্মকর্তা বাসা ভাড়া বাবদ বরাদ্দ মাসিক মূল বেতনের অর্ধেক টাকার পুরোটাই নিয়েছেন, যার পরিমাণ প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকা। অতিথিদের জন্য বরাদ্দ রেস্টহাউসে বিধি ভঙ্গ করে থাকার বিষয়টি নিয়ে স্টেশনে ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।

এর আগে এই স্টেশনের সাবেক ডিজিএম তরিকুল ইসলাম যিনি একই অফিস আদেশে কক্সবাজারে বদলি হয়েছেন, তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে টানা ৫ বছর কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনে রেস্টহাউসে থাকার। রেস্টহাউসে থাকা বাবদ কোনো অর্থ পরিশোধ করে যাননি এই কর্মকর্তা। এ নিয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ থেকে অডিট আপত্তিও দেওয়া হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। এরপরও নতুন ডিজিএম সুরচিত বড়ুয়া কোনো আপত্তি তোয়াক্কা না করে বেছে নিয়েছেন একই পথ। যদিও কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনে কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে তিন তারকা মানের সুসজ্জিত অফিসার্স ডরমেটরি এবং আবাসনের সুব্যবস্থা। অফিসার্স ডরমেটরির অধিকাংশ কক্ষই এখন ফাঁকা রয়েছে বলে জানা যায়। 

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আবাসন সুবিধায় থেকেও বাসা ভাড়া বাবদ অর্থ উত্তোলন চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫-এর ধারা ১৬(২) ও (৪)-এর লঙ্ঘন। ধারা দুটি যথাক্রমে বলছে, ‘সরকারি বাসস্থানে বসবাসকারী কর্মচারী বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন না এবং ভাড়াবিহীন বাসস্থানে থাকার অধিকারী হলে সেই কর্মচারীকে বাড়ি ভাড়া দিতে হবে না, তবে তিনি বাড়ি ভাড়া ভাতাও পাবেন না।’

তবে কুয়াকাটায় বদলি হয়ে আসার পর থেকে এই রেস্টহাউসে অবস্থান করছেন ডিজিএম সুরচিত। গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার থেকে ছুটিতে আছেন তিনি। এর আগের কর্মদিবস অর্থাৎ বুধবার ২০ আগস্টেও তিনি রেস্টাহাউসের কক্ষে ছিলেন বলে রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় একটি সূত্র। 

এদিকে কুয়াকাটার সাবেক ডিজিএম তরিকুল এবং বর্তমান ডিজিএম সুরচিতের দেখানো পথে উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির রেস্টহাউসে বরাদ্দ চাচ্ছেন কর্মকর্তারা। কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের ডিজিএম প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম সেখানকার রেস্টহাউসে বরাদ্দ চেয়ে গত ২০ আগস্ট বিএসসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর আবেদন করেছেন।   

কেপিআই স্থাপনায় অননুমোদিত প্রবেশের অভিযোগ সুরচিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ডিজিএম সুরচিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে বেসরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কেপিআই ‘১ক’ শ্রেণিভুক্ত স্পর্শকাতর স্থাপনা ল্যান্ডিং স্টেশনে প্রবেশের সুযোগ করে দেন।

পাশাপাশি তাদের স্পর্শকাতর সব স্থাপনা পরিদর্শনও করান। ফলে, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের আশঙ্কাও উত্থাপিত হয়েছে। গত এপ্রিলে তিনটি প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রতিনিধিদের একটি দল কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনে উপস্থিত হয়। এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তারা একটি কালো রঙের গাড়িতে করে সেখানে আসেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সিডিনেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মশিউর রহমানসহ মেটাকোর ও সামিটের কয়েকজন কর্মকর্তা।

তারা কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের ক্যাবল রুম, কো-লোকেশন রুম, ডেটা সেন্টার, নক রুম এবং সাব স্টেশন রুমসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘুরে দেখেন। ফুটেজে আরও দেখা যায়, সুরচিত বড়ুয়া অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অতিথি কর্মকর্তাদের এসব স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলো ঘুরিয়ে দেখান। 

কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন বাংলাদেশ সরকারের কেপিআই-১ক শ্রেণিভুক্ত, অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। এখান থেকেই দেশের ব্যান্ডউইথের একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হয়। এ স্থাপনায় প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমিত এবং যেকোনো পরিদর্শনের আগে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে প্রাইভেট সাবমেরিন কোম্পানির ভিজিটের বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কোনো মহাব্যবস্থাপককে অবহিত করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজারে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, সিডিনেটের বর্তমান সিইও মশিউর রহমান ছিলেন বিএসসিপিএলসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার সময়েই সুরচিত বড়ুয়াকে বিএসসিপিএলসিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে ইতোমধ্যেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট নিয়োগের সুবিধা মশিউর রহমান এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোগ করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই কেটেছেন গাছ

ডিজিএম সুরচিত বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ল্যান্ডিং স্টেশনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কোনো ক্ষেত্রেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেননি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা হলে তা পরিবেশ আইন ও বন আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। কেপিআই বা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গাছ কাটা আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।

যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই) এলাকায় গাছ কাটার পূর্বে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। গাছ কাটার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদ- থেকে লক্ষাধিক টাকা জরিমানারও বিধান রয়েছে।

সর্বশেষ, সুরচিত ল্যান্ডিং স্টেশনের একটি বহু পুরোনো ও বৃহৎ আকৃতির গাছ নিজ সিদ্ধান্তে কেটে ফেলেছেন, যা ছিল জেনারেটর রুমের ঠিক ওপরে। গাছটি কাটার আগে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার জন্য কোনো আবেদন করেননি। এমনকি এ বিষয়ে বিএসসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেননি। গাছটি কাটার ফলে বর্তমানে স্টেশনের জেনারেটর রুমটি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে একটি জেনারেটরে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপ সৃষ্টি হয়ে অগ্নিকা- ঘটে সেটি সম্পূর্ণ বিকল হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আরও অভিযোগ, গাছ কাটার অর্থ অফিসের অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি বরং এই টাকা দিয়ে সুরচিত বড়ুয়া এবং স্টেশনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের আসবাব বানিয়েছেন।

নিয়োগেও অনিয়ম 

কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের উপমহাব্যবস্থাপক সুরচিত বড়ুয়ার নিয়োগে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিপ্লব বড়ুয়ার হস্তক্ষেপে বিএসসিপিএলসিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই তাকে সরাসরি উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ দেন।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সুরচিত বড়ুয়া চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় (আইআইইউসি) থেকে কম্পিউটার অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে ডিগ্রি অর্জন করেন, তার ভর্তিকালীন সময়ে এই বিভাগটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে অনুমোদিত ছিল না।

দাপ্তরিক দায়িত্বে অবহেলা

এই কর্মকর্তার কক্সবাজারে থাকাকালে উপস্থিতির রেজিস্ট্রার খাতার একটি অনুলিপি থেকে দেখা যায়, তিনি ল্যান্ডিং স্টেশন প্রাঙ্গণে অবস্থিত আবাসিক ভবনের অনৈতিক সুবিধা আদায় করছেন। অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থান তিনি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় করতেন। রেজিস্ট্রার খাতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত কারণে তিনি অফিসে উপস্থিত না থেকে আবাসিক ভবনে অবস্থান করেছেন এবং উপস্থিতি রেজিস্ট্রার খাতা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ছুটির আবেদন না করে পরে সুবিধামতো স্বাক্ষর করেছেন যা স্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।  

এসব অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে ডিজিএম সুরচিত বড়ুয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বরং প্রধান কার্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। 

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সে আগে থাকত, এখন থাকে না। তাকে রেস্টহাউসে না থাকার জন্য বলা হয়েছে। তারপরও যদি থেকে থাকেন, বিষয়টি দেখব।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!