ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

সোফাইতে অবিস্মরণীয় যুদ্ধের অপেক্ষা

গোল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ০৬:৩৫ এএম

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের রোমাঞ্চ এখন তুঙ্গে। বিশ্বমঞ্চের সেরা চারে ওঠার লড়াইয়ে আগামীকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সোফাই স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের দুই পরাশক্তি স্পেন এবং বেলজিয়াম। একদিকে টিকিটাকা ফুটবলের আধুনিক রূপকার লা রোহা খ্যাত স্পেন, অন্যদিকে সোনালি প্রজন্মের উত্তরসূরিদের নিয়ে গঠিত লড়াকু রেড ডেভিলস বেলজিয়াম। শক্তির ভারসাম্য, ঐতিহাসিক দ্বৈরথ এবং সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে এই ম্যাচটি কেবল একটি কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক ধ্রুপদি মহাকাব্যে রূপ নিতে যাচ্ছে।

দ্বৈরথের খতিয়ান

স্পেন ও বেলজিয়ামের ফুটবলীয় শত্রুতার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দল দুটি এর আগে বহুবার মুখোমুখি হলেও, বিশ্বকাপ মঞ্চে তাদের দেখা হয়েছে মাত্র দুইবার।

তবে সেই দুই দেখাই ফুটবল রোমান্টিকদের মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে গেছে।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ : শেষ আটের সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে স্পেনকে পরাজিত করেছিল বেলজিয়াম। বেলজিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সেটি ছিল অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।

১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপ : গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সেবার বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূর্বের হারের মধুর প্রতিশোধ নেয় স্পেন।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দীর্ঘ চার দশক পর আবারও এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি হচ্ছে। সামগ্রিক হেড টু হেড রেকর্ডে স্পেন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নকআউট পর্বের স্নায়ুচাপের ম্যাচে অতীতের পরিসংখ্যান কেবলই কাগজের হিসাব। অতীত আর বর্তমানের এই মেলবন্ধন এবারের কোয়ার্টার ফাইনালকে আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ ও আবেগঘন করে তুলেছে।

স্পেনের রণকৌশল

লুইস ডি লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন এবার টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছে এক নতুন দর্শন নিয়ে। প্রথাগত বিরক্তিকর টিকিটাকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে তারা এখন খেলছে গতিময় ও আগ্রাসী ফুটবল। রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের নিখুঁত বোঝাপড়া স্পেনের প্রধান শক্তি।

রদ্রি এবং পেদ্রির মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডারদের পা বেয়ে আসা বলগুলো যেমন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করছে, তেমনি উইংয়ে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি রক্ষণভাগের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। এবারের টুর্নামেন্টে তারা টানা তিন ইউরোপীয় প্রতিপক্ষকে হারানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে রেখেছে। স্পেনের রক্ষণভাগ এবার এতটাই সুসংহত যে, প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের জন্য তাদের বক্সে ঢোকাটাই এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেলজিয়ামের পুনরুত্থান

অন্যদিকে, বেলজিয়াম দলটিকে অনেকেই সোনালি প্রজন্মের অবসান বলে হেয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডোমেনিকো টেডেসকোর অধীনে রেড ডেভিলসরা প্রমাণ করেছে যে, তাদের শেষ চিনে ফেলা এত সহজ নয়। শেষ ষোলোর ম্যাচে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আগমনী বার্তা স্পষ্ট করেছে। কেভিন ডি ব্রুইনার নিখুঁত পাসিং এবং রোমেলু লুকাকুর শারীরিক সক্ষমতা বেলজিয়ামের আক্রমণভাগকে যেকোনো দলের জন্য ভীতিজাগানিয়া করে তুলেছে।

ম্যাচের আগে বেলজিয়ান শিবিরের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়া। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা স্প্যানিশ ফুটবলারদের মনস্তত্ত্ব খুব ভালো করেই জানেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, স্পেন নিঃসন্দেহে শক্তিশালী দল, তবে তাদের পরিকল্পনা এবং সামর্থ্যরে ওপর তার পূর্ণ আস্থা আছে। স্পেনকে হারিয়ে শেষ চারে উঠবে, এই আত্মবিশ্বাস দলের সবার মধ্যে রয়েছে। কুর্তোয়ার এই হুংকার স্প্যানিশ শিবিরের জন্য যে বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা, তা বলাই বাহুল্য।

ট্যাকটিক্যাল যুদ্ধ

এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে মূলত মাঝমাঠের দখল কার হাতে থাকে তার ওপর। স্পেনের মাঝমাঠ যদি রদ্রি-পদ্ধতিতে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে পারে, তবে বেলজিয়ামকে পুরো ম্যাচেই রক্ষণাত্মক ভূমিকায় থাকতে হবে।

বিপরীতে, কেভিন ডি ব্রুইনা যদি মাঝমাঠ থেকে কাউন্টার অ্যাটাকের মন্ত্র বুনে দিতে পারেন, তবে স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্স বড় বিপদে পড়বে। লুইস ডি লা ফুয়েন্তের হাই-প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে বেলজিয়ামের ডিরেক্ট ফুটবল ও গতিময় কাউন্টার; এই দুই ভিন্ন ঘরানার ট্যাকটিক্যাল যুদ্ধ দেখার জন্য মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।

এগিয়ে কে?

কাগজে-কলমে এবং ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে স্পেনকে কিছুটা এগিয়ে রাখতেই হবে। তাদের বর্তমান স্কোয়াডের গভীরতা এবং টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাদের ফেভারিটের তকমা দিচ্ছে। তবে বেলজিয়ামের সাম্প্রতিক ফর্ম, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের ৪ গোল করার মহড়া, নির্দেশ করে যে তারা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম।

স্পেন যদি তাদের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, তবে বেলজিয়ামের কাউন্টার অ্যাটাক তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তাই এই ম্যাচে কোনো নির্দিষ্ট দলকে পরিষ্কার ফেভারিট বলাটা হবে চরম ভুল।

একদিকে স্পেনের শৈল্পিক পাসিং, অন্যদিকে বেলজিয়ামের গতি ও পেশিশক্তি, এই দুইয়ের সংমিশ্রণে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি একটি অবিস্মরণীয় ম্যাচ হতে যাচ্ছে।